Monday 15 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আলাদা ‘স্বাস্থ্য পুলিশ’ গঠনসহ ১৭ দফা দাবি হেলথ ক্যাডারদের

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৫ জুন ২০২৬ ২৩:১৫

বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারের কাছে ‘স্বাস্থ্য পুলিশ’ গঠনসহ ১৭ দফা সমন্বিত প্রস্তাবনা করেছে বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন।

সোমবার (১৫ জুন) বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত ‘নিরাপদ কর্মস্থল চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এ সময় লিখিত বক্তব্য ও প্রেস নোট উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের অর্থ সম্পাদক ডা. আহমেদ খালেদুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে গড় আয়ু বৃদ্ধি (৭২ বছরের বেশি) এবং শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোসহ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে এই অর্জনের পেছনে নিরলস কাজ করে যাওয়া চিকিৎসকদের বাস্তব কর্মপরিবেশ আজ সংকটাপন্ন। সাম্প্রতিক শরীয়তপুর, কুমিল্লা, বরিশাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকদের ওপর ধারাবাহিক এবং ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে। দায়িত্ব পালনরত সরকারি চিকিৎসকদের ওপর এ ধরনের হামলা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সিকিউরিটি কাঠামো ও কর্মপরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার স্বাস্থ্য বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে বক্তারা বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে এই বাজেট পুরোপুরি ব্যয় করা যায় না, যা দূর করা প্রয়োজন। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আনসার নিয়োগের সাময়িক সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানান, তবে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পরবর্তীতে আলাদা ‘স্বাস্থ্য পুলিশ’ গঠন এখন সময়ের দাবি। একই সাথে গণমাধ্যম ও জনপ্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের ‘প্রতিপক্ষ’ না ভেবে ‘সহযোগী অংশীদার’ হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

চিকিৎসালয় ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং জনগণের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে তুলে ধরা ১৭ দফা দাবি হলো-

১. স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তায় বিশেষ পদক্ষে-

ক) স্বাস্থ্য পুলিশ গঠন ও হাসপাতালভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালীকরণ।
খ) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
গ) ডিজিটাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম চালু।
ঘ) হাসপাতালে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন।
ঙ) হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় মামলা বাধ্যতামূলকভাবে করা।
চ) স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মানসিক ও আইনি সহায়তা সেল চালু।
ছ) নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা।
জ) ‘চিকিৎসক ও রোগী প্রতিপক্ষ নয়, সহযোদ্ধা’— এই বার্তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।

২. সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আধুনিক অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন।
৩. ক্যাডার সার্ভিসের আইন, জ্যোষ্ঠতা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ।
৪. স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনভিত্তিক নতুন পদসৃষ্টি নিশ্চিতকরণ।
৫. শয্যা সংখ্যার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি বন্ধ এবং বাস্তবসম্মত রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ।
৬. বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসকের জন্য দৈনিক রোগী দেখার যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ (প্রতি চিকিৎসক সর্বোচ্চ ৪০ জন রোগী)।
৭. সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন সকল শূন্যপদে দ্রুত সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগ নিশ্চিতকরণ।
৮. সকল সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে “Code Blue” সেবা চালু ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
৯. জরুরি বিভাগ, ট্রما সেন্টার, ICU, CCU, ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি ভাতা প্রদান নিশ্চিতকরণ।
১০. ঈদসহ সকল সরকারি ও নির্বাহী আদেশে ছুটির সময় দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা প্রদান নিশ্চিতকরণ।
১১. স্বাস্থ্য কর্মীদের জরুরি ও ন্যায্য ছুটি বাতিলের সংস্কৃতি বন্ধ করা ও ন্যায়ভিত্তিক ছুটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ।
১২. চিকিৎসকসহ সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি খরচে দেশে ও বিদেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ।
১৩. চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশ ভ্রমণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
১৪. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুকরণ।
১৫. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পদায়নের সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
১৬. স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে চিকিৎসকদের “প্রতিপক্ষ” নয়, “সহযোগী অংশীদার” হিসেবে সম্পর্ক নিশ্চিতকরণ।
১৭. স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনে তথ্যের যথার্থতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং সমন্বয় জোরদার করা।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ডা. মোহাম্মদ নেয়ামত হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ডা. মির্জা মুহাম্মদ তাইয়েবুল ইসলাম। এ ছাড়া আন্তঃক্যাডার সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ), প্ল্যাটফর্ম এবং ইন্টার্ন ডক্টরস এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, দেশের জনগণের জন্য একটি টেকসই, নিরাপদ ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার দ্রুত এই ১৭ দফা প্রস্তাবনা বিবেচনা করে গঠনমূলক আলোচনায় বসবে।

সারাবাংলা/এমএইচ/পিটিএম