প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটকের পর ভেনেজুয়েলার ঋণ সংকটকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অমীমাংসিত সার্বভৌম খেলাপি ঋণ হিসেবে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে চলা চরম অর্থনৈতিক মন্দা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ২০১৭ সালের শেষ দিকে সরকার এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পিডিভিএসএ’ তাদের আন্তর্জাতিক বন্ডের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
২০১৭ সালের পর থেকে বকেয়া আসলের সঙ্গে পুঞ্জীভূত সুদ এবং অতীতে বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদের আইনি ক্ষতিপূরণ যুক্ত হয়ে ভেনেজুয়েলার ঋণের বোঝা বহুগুণ বেড়েছে। ফলে মোট বৈদেশিক দায় এখন মূল বন্ডের অভিহিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভেনেজুয়েলার এই ‘ডিস্ট্রেসড ডেট’ বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন থেকেই সেখানে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বাজি ধরছিলেন।
ভেনেজুয়েলার ঋণের পরিমাণ কত?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের (৭ লাখ ৩৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা) বন্ড খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘পিডিভিএসএ’র দায়বদ্ধতা, দ্বিপাক্ষিক ঋণ এবং আদালতের নির্দেশে ধার্যকৃত ক্ষতিপূরণসহ মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫০ থেকে ১৭০ বিলিয়ন ডলারের (১৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা-২০ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) মতো। পুঞ্জীভূত সুদ এবং আদালতের রায়গুলো কীভাবে গণনা করা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এই অংকের তারতম্য হতে পারে।
আরও পড়ুন:গুপ্তচর, ড্রোন ও ডেল্টা ফোর্স: যেভাবে তুলে নেওয়া হয় মাদুরোকে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার নামমাত্র জিডিপি ছিল প্রায় ৮২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী দেশটির ঋণ ও জিডিপির অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ১৮০ শতাংশ থেকে ২০০ শতাংশের মধ্যে।
২০২০ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া পিডিভিএসএ-র একটি বন্ডের জামানত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত তেল শোধনাগার ‘সিটগো’র সিংহভাগ শেয়ার রাখা হয়েছিল। সিটগোর মালিকানা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র অধীনে। পাওনা আদায়ের লক্ষে পাওনাদাররা এখন আদালতের তত্ত্বাবধানে এই সিটগো সম্পদটি বাজেয়াপ্ত করার চেষ্টায় রয়েছে।
পাওনাদারের তালিকায় কারা আছে?
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এবং ভেনেজুয়েলার ঋণ কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে এই ঋণের মালিকানায় কারা আছে, তার সঠিক হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বাণিজ্যিক পাওনাদারদের বড় একটি অংশ সম্ভবত আন্তর্জাতিক বন্ডহোল্ডার এবং বিশেষায়িত ‘ডিস্ট্রেসড-ডেট’ বিনিয়োগকারী (যাদের অনেক সময় ‘ভালচার ফান্ড’ বা শকুনি তহবিল বলা হয়)।
পাওনাদারদের মধ্যে এমন কিছু কোম্পানিও রয়েছে যারা অতীতে ভেনেজুয়েলা সরকারের মাধ্যমে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ফলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। মার্কিন আদালত ইতিমধ্য়েই কনোকো-ফিলিপস এবং ক্রিস্টালেক্সসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোর পক্ষে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণের রায় বহাল রেখেছেন। এর ফলে এই দাবিগুলো এখন ঋণে পরিণত হয়েছে এবং পাওনাদাররা তাদের পাওনা উশুল করতে ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক সম্পদ হস্তগত করার সুযোগ পেয়েছে।
আরও পড়ুন: মাদুরোর নিরাপত্তা কর্মীদের অনেকেই নিহত
আদালত স্বীকৃত পাওনাদারদের একটি ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠী এখন মার্কিন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিটগো-র মূল প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের পাওনা আদায়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ডেলাওয়্যারের একটি আদালত সিটগো-র মূল প্রতিষ্ঠান ‘পিডিভি হোল্ডিং’ নিলামের জন্য প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের দাবি নথিভুক্ত করেছে, যা সিটগো-র মোট সম্পদের আনুমানিক মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি।
উল্লেখ্য, এই পিডিভি হোল্ডিং হলো ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র একটি সম্পূর্ণ মালিকানাধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান।
কারাকাসের (ভেনেজুয়েলা সরকার) দ্বিপাক্ষিক পাওনাদারদের তালিকায় প্রধানত চীন ও রাশিয়া রয়েছে। এই দেশগুলো বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার রাজনৈতিক গুরু সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আমলে ভেনেজুয়েলাকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছিল। তবে ভেনেজুয়েলা গত কয়েক বছর ধরে ঋণের কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ না করায় ঋণের সঠিক পরিমাণ যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন।
ঋণ পুনর্গঠন কি সম্ভব?
বিপুল সংখ্যক পাওনাদারের দাবি, চলমান আইনি জটিলতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে একটি আনুষ্ঠানিক ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঋণ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির প্রয়োজন হয়, যা দেশের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু গত প্রায় দুই দশক ধরে আইএমএফের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কোনো বার্ষিক আলোচনা হয়নি এবং বর্তমানে আইএমএফের অর্থায়ন থেকেও দেশটি বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও মাদুরোকে তুলে নেওয়ায় বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার জন্য আরেকটি বড় বাধা। ২০১৭ সাল থেকে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, উভয় প্রশাসনের অধীনেই এমন সব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে যার ফলে মার্কিন ট্রেজারির বিশেষ অনুমতি ছাড়া ভেনেজুয়েলার পক্ষে নতুন ঋণ নেওয়া বা পুরনো ঋণ পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত; তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রই এখন এই তেল উৎপাদনকারী দেশটি ‘পরিচালনা’ করবে।
পাওনা আদায়ের সম্ভাবনা কেমন?
২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার বন্ডগুলো সূচক পর্যায়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে। ‘মার্কেটঅ্যাক্সেস’-এর তথ্যমতে, এই বন্ডগুলোর প্রতি ১ ডলার মূল্যের বিপরীতে বর্তমানে ২৭ থেকে ৩২ সেন্টে লেনদেন হচ্ছে। গত নভেম্বরে সিটিগ্রুপের বিশ্লেষকরা আভাস দিয়েছিলেন, ঋণের স্থায়িত্ব ফেরাতে এবং আইএমএফ-এর শর্ত পূরণ করতে মূল ঋণের অন্তত ৫০ শতাংশ মওকুফ করতে হতে পারে।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত
সিটির মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলা পাওনাদারদের ৪.৪ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদী একটি বন্ড এবং বকেয়া সুদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ বছর মেয়াদী একটি ‘জিরো-কুপন নোট’ অফার করতে পারে। যদি এই প্যাকেজের প্রস্থান লভ্যাংশ ১১ শতাংশ ধরা হয়, তবে এর বর্তমান নিট মূল্য হবে ডলার প্রতি ৪৫ সেন্টের কাছাকাছি। আর যদি ভেনেজুয়েলা তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত কোনো বিশেষ ডিভিডেন্ড স্কিম চালু করে, তবে এই আদায়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে ‘অ্যাবারডিন ইনভেস্টমেন্টস’-এর মতো অন্যান্য বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে এই আদায়ের হার ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টের মধ্যে থাকতে পারে।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কী?
ঋণ পরিশোধের এই সব আশাবাদ মূলত একটি ভয়াবহ বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৩ সালের পর থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে; কারণ তখন থেকেই তেল উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে, মুদ্রাস্ফীতি লাগামহীন হয়েছে এবং দারিদ্র্য চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি তেল উৎপাদন কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বিশ্ববাজারে তেলের নিম্নমুখী দাম এবং ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের ওপর ছাড়ের কারণে সরকারের আয় খুব একটা বাড়ছে না। ফলে ঋণ পুনর্গঠন ছাড়া এই দায় মেটানোর কোনো পথ নেই। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর সাম্প্রতিক মার্কিন অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: যে কারণে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে আটক করলেন ট্রাম্প
ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন পুনরুদ্ধারের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। তবে এর বিস্তারিত প্রক্রিয়া বা সময়সীমা এখনো অস্পষ্ট। বর্তমানে কেবল ‘শেভরন’ একমাত্র মার্কিন বড় তেল কোম্পানি হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সূত্র: রয়টার্স