Tuesday 03 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত
বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস-শেয়ারবাজারে অস্থিরতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩ মার্চ ২০২৬ ১৩:১৩ | আপডেট: ৩ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩৪

কাতারের রাস লাফান শিল্প নগরী এলাকা। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পালটা হামলা অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি, কাতার ও সৌদি আরবে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি শেয়ার বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী

বিবিসির বিশ্লেষণে জানা গেছে,  সোমবার (২ মার্চ) বৈশ্বিক মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারে পৌঁছে যায়। সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনার পর বাজারে ঊর্ধ্বগতি ত্বরান্বিত হয়।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় গ্যাস বাজারেও এক পর্যায়ে দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় এবং শেষে প্রায় ৩৯ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় লেনদেন শেষ হয়। সামরিক হামলার পর কাতার এনার্জি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিলে বাজারে চাপ আরও বাড়ে।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা ও উৎপাদন বন্ধ

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন দেশটির রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এর পরপরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’ তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। এছাড়া রাজধানী দোহার দক্ষিণে মেসাইদ এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংকেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের উপকূলে অবস্থিত বিখ্যাত রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’।

জলপথে অস্থিরতা

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে তা লক্ষ্যবস্তু করা হবে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল-গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়।

জাহাজ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে, অন্তত ১৫০টি ট্যাংকার প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘ইউকেএমটিও’ আরব ও ওমান উপসাগরে একাধিক নিরাপত্তা ঘটনার কথা জানিয়েছে এবং জাহাজগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ ‘মায়েরস্ক’ বাব এল-মান্দেব ও সুয়েজ খাল রুটে চলাচল সাময়িক স্থগিত করে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘উত্তমাশা অন্তরীপ’ ঘুরিয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়াবে।

শেয়ারবাজারের অস্থিরতা

সোমবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি শেয়ারবাজার সূচক কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তবে দিনের মাঝামাঝি সময়ে নাসডাক (Nasdaq) এবং S&P 500 তাদের প্রাথমিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং সামান্য লাভে লেনদেন শেষ করে। লন্ডনের FTSE 100 সূচক ১.২% পতন নিয়ে বন্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়া বার্কলেস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি-র মতো বড় ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামও কমেছে। বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা, জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের CAC-40 সূচক ২.২% এবং জার্মানির Dax সূচক ২.৬% পতন নিয়ে দিন শেষ করেছে। তবে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ছিল চড়া।

ওপেক+ (OPEC+) ও সরবরাহ পরিস্থিতি

গত রোববার (১ মার্চ) তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ তেলের দামের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উত্তোলনের বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারের অস্থিরতা কমাতে এই সামান্য পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি খুব একটা কাজে আসবে না।

যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (AA)-এর প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং সতর্ক করেছেন যে, এই ডামাডোল বিশ্বজুড়ে পেট্রোলের দাম বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বোমাবর্ষণ এবং অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা অনিবার্যভাবে তেলের দাম বাড়াবে।’ সাধারণ মানুষের জন্য পাম্পে তেলের দাম কতটা বাড়বে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর।

বিশ্লেষকদের মত

এমএসটি মারকুই-এর জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সাউল কাভোনিক বলেন, বাজার এখনো পূর্ণ আতঙ্কে নেই; কারণ প্রধান উৎপাদন অবকাঠামো সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হয়নি। তবে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক না হলে মূল্যচাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

দুবাইভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্বামার এনার্জির প্রধান নির্বাহী রবিন মিলসের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, জ্বালানির দাম দীর্ঘসময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি

বাংলাদেশের আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ কাতার থেকে আসে। ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতিবছর ৪০ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করে ‘কাতার এনার্জি’। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাতারের উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হতে পারে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, মার্চের জন্য নির্ধারিত ১১টি কার্গোর মধ্যে ৯টি ইতোমধ্যে সংঘাতপূর্ণ এলাকা পার হয়ে এসেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর