Friday 06 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইরানের ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৪০ লাখ ডলার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৬ মার্চ ২০২৬ ২২:২৯ | আপডেট: ৬ মার্চ ২০২৬ ২২:৩২

ইরানের শাহেদ সিরিজের ড্রোন। ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের আকাশে পরিচিত এক আতঙ্কের নাম ইরানের শাহেদ সিরিজের ড্রোন, যা এখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দেখা যাচ্ছে। একেকটি শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে ইরানের খরচ হয় মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রকে এই সস্তা ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যবহার করতে হচ্ছে একেকটি ২০ লাখ থেকে ৪০ লাখ ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট মিসাইল। অর্থাৎ, মাত্র একটি ড্রোন ধ্বংস করতেই যুক্তরাষ্ট্রকে তার মূল্যের চেয়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ গুণ বেশি দামের মিসাইল খরচ করতে হচ্ছে।

গত চার দিনে বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ এই ড্রোনের মাধ্যমে হামলার শিকার হওয়ার খবর জানিয়েছে। এই তুলনামূলক কম দামী কিন্তু বিধ্বংসী ড্রোনগুলো বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন ভবন ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে, যা তেহরানের পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের ড্রোন অভিযানের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারে একটি ডেল্টা-উইং (ত্রিভুজাকৃতির ডানা) ড্রোন বাহরাইনের একটি আবাসিক টাওয়ারের দিকে ধেয়ে আসছে। ড্রোনটির ইঞ্জিনের সেই বিশেষ বিকট শব্দ, যা অনেকটা ঘাস কাটার যন্ত্রের শব্দের মতো, সেটি আছড়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল; এরপরই এটি ভবনটিতে আঘাত হানে এবং আশপাশের বারান্দাগুলোতে ধ্বংসাবশেষ ও আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে এক হাজারেরও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সোমবার জানিয়েছে, তারা ৬৮৯টি ড্রোনের মুখোমুখি হয়েছে এবং এর মধ্যে ৬৪৫টি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এর অর্থ হলো প্রায় ৪৪টি ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে পেরেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই ড্রোনগুলোর বেশিরভাগই সম্ভবত শাহেদ-১৩৬, যা ইরানের তৈরি একটি সস্তা ‘লোইটারিং মিউনিশন’ (এক ধরণের কামিকাজে ড্রোন) এবং এটি মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত বা অকেজো করার জন্য নকশা করা হয়েছে।

এই ড্রোনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার ২ দশমিক ৫ মিটার। এটি প্রায় ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে। যদিও এই ড্রোনের বিস্ফোরণ বিশাল কোনো ভবন ধসিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট নয়, তবে এটি উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি সাধন এবং ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ড্রোনগুলো তুলনামূলক ধীরগতির এবং শব্দবহুল, কিন্তু এদের ২,০০০ কিলোমিটার (১,২৫০ মাইল) পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা থাকায় এরা সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। রাডার এড়াতে এরা সাধারণত নিচু উচ্চতা দিয়ে পূর্ব-নির্ধারিত পথে উড়ে যায়; যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, অপারেটররা এগুলোকে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আঘাত হানার ঠিক আগে দিক পরিবর্তন করতেও সক্ষম।

শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি তৈরি করেছে ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার’, যা একটি ইরানি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতে এটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত।

এই ড্রোনটি প্রথম আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আসে ২০২১ সালের জুলাই মাসে, যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পৃক্ত তেলবাহী জাহাজ ‘মার্সার স্ট্রিট’-এ হামলায় এটি ব্যবহৃত হয় এবং একজন ব্রিটিশ ও একজন রোমানীয় নাগরিক নিহত হন। বিশ্লেষকরা আরও বিশ্বাস করেন, ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক এবং খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলায় একই ধরনের ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছিল।

২০২২ সালের শেষের দিকে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে শাহেদ ড্রোন মোতায়েন শুরু করে, তখন এই অস্ত্রটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। প্রাথমিকভাবে ইরান থেকে আমদানি করা হলেও পরে এর নকশা মস্কোর সঙ্গে শেয়ার করা হয়, ফলে রাশিয়া ভলগা নদীর তীরে ইয়েলাবুগা কারখানায় এগুলো দেশীয়ভাবে উৎপাদন শুরু করে।

রাশিয়া প্রায়ই ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ব্যবহার করে, যেখানে শত শত শাহেদের পাশাপাশি ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়ে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিশেহারা করে ফেলা হয়।

এর বিপরীতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে দেখা যাওয়া ড্রোনগুলো বড় কোনো সমন্বিত ঝাঁকের বদলে এককভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে দেখা গেছে। ইউক্রেনে এই ড্রোনগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংসে বিশেষ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যা শীতের মাসগুলোতে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের সৃষ্টি করেছিল। একই কৌশল মধ্যপ্রাচ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে।

গত সোমবার একটি ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাস তানুকা রিফাইনারিতে (দেশের বৃহত্তম তেল শোধনাগার) আগুন ধরে যায় এবং এটি সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। যদিও কর্মকর্তারা ব্যবহৃত অস্ত্রের নাম নিশ্চিত করেননি, তবে ক্ষয়ক্ষতির ধরণ ছিল অনেকটা শাহেদ-টাইপ ড্রোন হামলার মতো।

এর বিধ্বংসী ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই ড্রোনগুলো তৈরি করা তুলনামূলক সস্তা। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন যে প্রতিটি শাহেদের খরচ ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলারের মধ্যে। এটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের তুলনায় অনেক কম, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই ড্রোনগুলোকে প্রতিহত করতে ব্যবহার করে।

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত ফাইটার জেট বা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে, যেগুলোর একেকটির খরচ ড্রোনের দামের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

সোমবার এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, ‘একমুখী আক্রমণকারী ইউএভির হুমকি এখনো অটল রয়েছে। আমাদের সিস্টেমগুলো এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে মোকাবিলায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং দ্রুত লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করছে। তবে এই খরচের ভারসাম্যহীনতা একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকোর মতে, ড্রোন তৈরির চেয়ে সেগুলো ধ্বংস করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রিকো অনুমান করেন, ইরান একটি শাহেদ ড্রোন তৈরি করতে ১ ডলার খরচ করলে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথাগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সেটি ভূপাতিত করতে ২০ থেকে ২৮ ডলার খরচ হয়।

তিনি বলেন, যদি এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তবে তাদের সম্ভবত এই সংকট মোকাবিলায় আরও টেকসই কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

লন্ডন ভিত্তিক ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স’-এর তদন্তকারী কাইল গ্লেন গার্ডিয়ানকে বলেন, বর্তমান সংঘাতই স্পষ্ট করে দিচ্ছে কেন ইরান এই প্রযুক্তিতে এত বেশি বিনিয়োগ করেছে। একটি যুদ্ধের ঠিক এই পরিস্থিতিগুলোর জন্যই ইরান মূলত এই ড্রোনগুলো তৈরি করেছিল।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর