কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেখানে কর্মরত প্রেস সেক্রেটারি তারিক চয়ন প্রকাশ্যে ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি হাইকমিশনার এবং মিশন প্রধান শিকদার মো. আশরাফুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপনের পর কূটনীতিক পাড়ায় নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার (৮ মার্চ) তারিক চয়ন তার ফেসবুক পেজে মিশন প্রধানের বিরুদ্ধে একটি বিস্তারিত পোস্টে কূটনীতিকের নিরপেক্ষতা এবং আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেছেন।
চয়নের মতে, আশরাফুর রহমান প্রায়ই বলেন, ‘আমরা সরকারি কর্মকর্তা, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আমরা সেই সরকারেরই সেবা করি।’ তবে, চয়ন অভিযোগ করেছেন মিশন প্রধানের কার্যকলাপ এই নীতির প্রতিফলন ঘটায় না, বরং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে চয়ন বলেন, বর্তমানে ভারতে বাংলাদেশের ছয়টি কূটনৈতিক মিশন রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নয়াদিল্লিতে হাই কমিশন, কলকাতা, মুম্বাই ও চেন্নাইতে ডেপুটি হাই কমিশন এবং আগরতলা ও গুয়াহাটিতে সহকারী হাই কমিশন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর, এই মিশনগুলি সরকারী আপডেট এবং কার্যক্রম জানানোর জন্য নতুন ফেসবুক পেজ খুলেছে বলে জানা গেছে।
তারিক চয়ন উল্লেখ করেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে, ভারতে অবস্থিত সকল বাংলাদেশি মিশনের সকল ফেসবুক পেইজ নির্বাচনের ফলাফল এবং নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পর্কিত পোস্ট করে।
ওই পেইজগুলোতে ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সফরের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যিনি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
তবে চয়নের মতে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনই একমাত্র মিশন যেখানে নির্বাচনের ফলাফল, নতুন সরকার গঠন বা প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে কোনো পোস্ট করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, মিশনের ফেসবুক পেজে যে কেউ গেলেই মনে হবে যে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে ঘুরে তারিক চয়নের দাবির সত্যতা মিলেছে।
তারিক চয়ন আরও বলেন, বিদেশে বেশ কয়েকটি মিশনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রেস উইং দ্বারা পরিচালিত হয় তা জানার পর, তিনি এর আগে আশরাফুর রহমানকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তার মতে, ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি হাই কমিশনার বলেছিলেন যে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মিশন নিজেই এগুলো পরিচালনা করবে।
যখন চয়ন সম্প্রতি জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, নির্বাচন বা নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে কেন কোনো পোস্ট করা হচ্ছে না, তখন তিনি অভিযোগের সুরে জবাব দিয়েছিলেন, “আরে ভাই, এগুলা দেওয়ার জিনিস নাকি!”
চয়ন তার পোস্টে সমালোচনা করে বলেন, একটি মাত্র পোস্টে মিশন প্রধানের ২৮টি ব্যক্তিগত ছবি রয়েছে, যা একটি সরকারী কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য অনুপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে।
তারিক চয়ন আরও অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের আগে আশরাফুর মিশন কর্মীদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে না। তিনি আরও দাবি করেছেন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ্যে সমর্থন করার জন্য এবং পরে নতুন সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন এমন একজন বিএনপি নেতার সাথে একটি ছবি পোস্ট করার জন্য তাকে বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করা হয়েছিল এবং চাপ দেওয়া হয়েছিল।
অন্য একটি ঘটনায় চয়ন বলেছেন, একজন ভারতীয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা সম্প্রতি তার সম্পাদিত “অবিসংবাদিত তারেক রহমান” শিরোনামের একটি বই ধরে একটি ছবি তুলেছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেছেন, আশরাফুর মিশনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সামনে ওই অভিনেতা সম্পর্কে আপত্তিকর এবং অনুপযুক্ত মন্তব্য করেছিলেন যেটি তিনি নিয়মিতই করে থাকেন।
তারিক চয়ন জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি কোনও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছাড়াই পোস্টটি লিখেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি তদবিরের মাধ্যমে তার পদ অর্জন করেননি এবং তাই এটি হারানোর ভয় পান না। তিনি আরও বলেন যে, উপরের নির্দেশের চেয়ে বরং তার বিবেকের দ্বারা কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
চয়ন আরও সতর্ক করে বলেন, মিশনের ফেসবুক পেজে পোস্ট মুছে ফেলা বা এডিট করা পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন করবে না, কারণ সমস্ত প্রাসঙ্গিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি হাইকমিশনার শিকদার মো. আশরাফুর রহমান বা কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। বিষয়টি কূটনৈতিক এবং প্রবাসী মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার গুরুত্ব সম্পর্কে।