ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি নিশানা করে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। এ ঘটনা চলমান যুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটির প্রকৃত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার (২১ মার্চ) ইরান দুটি মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটির দিকে। তবে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানেনি বলে দাবি করা হচ্ছে। এগুলো প্রতিহত করা হয়েছে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এরপরও ইরানের এই হামলার প্রচেষ্টা ঝুঁকির মানচিত্র বদলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘোষিত সক্ষমতার বাইরে পাল্লা?
দিয়েগো গার্সিয়া যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রবাল দ্বীপ। প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে, যা তেহরানের ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্র পাল্লার প্রায় দ্বিগুণ। অথচ ইরান এত দিন দাবি করে আসছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটার। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছিলেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটার। যদি ইরান সত্যিই তাদের ঘোষিত সীমার দ্বিগুণ দূরত্বে হামলার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে এর মানে হলো ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ভাবতে হবে এবং শত্রুপক্ষের হিসাব-নিকাশ পালটাতে হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিয়েগো গার্সিয়া
ডিয়েগো গার্সিয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি, যেখানে ভারী বোমারু বিমান, নজরদারি উড়োজাহাজ এবং বিস্তৃত লজিস্টিক অবকাঠামো রয়েছে। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, এই ঘাঁটি নিশানা করে হামলা চালানো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা শত্রুর আগের ধারণার চেয়েও বেশি। এই ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাছাড়া, দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলার চেষ্টার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত মহাসাগর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। দেশটি এই বার্তা দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘাঁটিই তাদের নাগালের বাইরে নয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দক্ষিণে সরাতে হবে, যা তাদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই এই ঘটনা ঘটলো। এর আগে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। এদিকে যুক্তরাজ্য “সমষ্টিগত আত্মরক্ষা” কাঠামোর আওতায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন জানিয়েছে। ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সতর্ক করেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অঞ্চলকে বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়াকে “বিলম্বিত” আখ্যা দিয়ে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার কথা স্বীকার করেছে যুক্তরাজ্য। তবে এ হামলা চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্যের একটি সরকারি সূত্র।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওই সূত্র জানায়, ইরান ঘাঁটিটিকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালালেও তা সফল হয়নি।
যুক্তরাজ্যের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই ‘ব্যর্থ হামলার চেষ্টা’ ঘটে যুক্তরাজ্য সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কিছু সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ঘোষণার আগেই। এসব ঘাঁটি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনা রয়েছে।
যুদ্ধের পরিসর বাড়াচ্ছে ইরান
আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়েগো গার্সিয়াকে নিশানা করা ইরানের সমরাস্ত্রের দীর্ঘ পাল্লার সক্ষমতাকে সামনে এনেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, এই হামলা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের বিপরীতে ইরানের পাল্টা জবাবের গভীরতা প্রকাশ করে।
এলিজা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। আর এমনটা ঘটলে উত্তেজনার নিয়ন্ত্রণ, যা যুক্তরাষ্ট্র চায় তা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, নতুন স্থাপনা, নতুন অবস্থান এখন ঝুঁকিতে পড়ছে।’
এই সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে পুরো কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, ইরান কোনো প্রথাগত যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করছে না। প্রথাগত যুদ্ধে তারা পারবেও না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি শক্তিশালী। বরং ইরান যুদ্ধের ব্যয়ের সমীকরণ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
এলিজা বলেন, ‘একটি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকে হুমকির মুখে ফেলার মাধ্যমে এই সংকেত দেওয়া হচ্ছে যে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার অর্থ হবে ক্রমাগত উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সংঘাতের পরিসর বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা—যুক্তরাষ্ট্রের দূরবর্তী ঘাঁটিগুলোও ঝুঁকির বাইরে নয়।
তাদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইরান প্রতিপক্ষকে প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করেছে, যা ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।