যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। পেট্রোলের দাম এরইমধ্যে বেড়েছে। তবে এই সংঘাতে শুধু জ্বালানিই নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক, গ্যাস ও পণ্যের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) বিশ্লেষণে বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, এখন তা কমে মাত্র কয়েকটিতে নেমে এসেছে। এতে খাদ্য থেকে শুরু করে স্মার্টফোন ও ওষুধ পর্যন্ত নানা পণ্যের দাম প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হরমুজ বন্ধ হলে সম্ভাব্য প্রভাব—
সার (খাদ্য)
পেট্রোকেমিক্যাল তেল ও গ্যাস থেকে তৈরি হয়। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এগুলো বিপুল পরিমাণে উৎপাদন ও রফতানি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো সার, যা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার, যেমন ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া ও ফসফেট হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই প্রণালি দিয়ে সারসংশ্লিষ্ট পণ্যের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, মার্চ ও এপ্রিল উত্তর গোলার্ধে বপন মৌসুম। এখন কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করলে বছরের শেষে ফলন কমে যাবে। এই সারগুলোর ঘাটতি বিশেষভাবে কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি হতে পারে।
জার্মানির গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কিল ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, ‘স্বল্প সময়ের জন্য প্রণালি বন্ধ থাকলেও পুরো একটি চাষ মৌসুম ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে, প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার পরও এর প্রভাব থাকবে।’
এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বে গমের দাম ৪.২% এবং ফল ও সবজির দাম ৫.২% পর্যন্ত বাড়তে পারে। খাদ্যদামের সামগ্রিক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে জাম্বিয়া (৩১%), শ্রীলঙ্কা (১৫%), তাইওয়ান (১২%) এবং পাকিস্তান (১১%)।
রাশিয়া সাধারণত বৈশ্বিক সার রপ্তানির প্রায় এক–পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে। বিশ্লেষকদের মতে, ঘাটতি পূরণে দেশটি উৎপাদন বাড়াতে পারে। রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছেন, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় উৎপাদক হিসেবে রাশিয়া ‘ভালো অবস্থানে’ রয়েছে।
হিলিয়াম (মাইক্রোচিপ)
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম গ্যাস কাতার থেকে আসে। এই গ্যাস হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবাহিত হয়। এটি প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের উপজাত। সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যেগুলো পরে কম্পিউটার, যানবাহন ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত মাইক্রোচিপে রূপান্তরিত হয়। হিলিয়াম হাসপাতালের এমআরআই স্ক্যানারের চুম্বক ঠান্ডা রাখতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর কাতারের বৃহৎ রাস লাফান প্ল্যান্টের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্লান্টে মূলত এই গ্যাস তৈরি হয়। কাতার সরকার জানিয়েছে, ক্ষতি অবকাঠামো মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। এতে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করেছিল, বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ‘দাম বেড়ে যেতে পারে’। এদিকে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধার প্রভাবে স্মার্টফোন থেকে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত নানা আধুনিক প্রযুক্তির দাম বাড়তে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো প্রশান্ত যাদব সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি হিলিয়াম সংকটে এমআরআইয়ের খরচও বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘এমআরআই মেশিনে চুম্বক ঠান্ডা রাখতে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ লিটার হিলিয়াম প্রয়োজন হয়। প্রতিবার স্ক্যান করার সময় এর কিছু অংশ বাষ্প হয়ে উবে যায়। মানুষ সাধারণত মনে করে হিলিয়ামের প্রধান ব্যবহার ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এমআরআই ও অন্যান্য চিকিৎসা ক্ষেত্রেও হিলিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পেট্রোকেমিক্যাল উপপণ্য (ওষুধ)
মিথানল ও ইথিলিনের মতো পেট্রোকেমিক্যাল থেকে উৎপন্ন উপপণ্য বৈশ্বিক ওষুধ উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও ভ্যাকসিন উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলো—সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন—বিশ্বের মোট পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দেশগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে এসব রাসায়নিক বিশ্বে রফতানি করে, যার প্রায় অর্ধেক যায় এশিয়ায়।
ভারত বিশ্বে জেনেরিক (ব্র্যান্ডবিহীন) ওষুধ রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদন করে, যার অনেকটাই পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পাঠানো হয়। এই ওষুধগুলোর বড় অংশ সাধারণত দুবাইসহ উপসাগরীয় বিমানবন্দর দিয়ে সরবরাহ করা হয়, যা সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বাড়তে পারে।
গন্ধক (ধাতু/ব্যাটারি)
গন্ধকও অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এটি বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয়ে রফতানি হয়। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত গন্ধকের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়।
গন্ধকের প্রধান ব্যবহার কৃষিতে সার হিসেবে হলেও, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গন্ধক দিয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়, যা তামা, কোবাল্ট ও নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণে এবং লিথিয়াম উত্তোলনে ব্যবহৃত হয়। এই সব ধাতুই ব্যাটারি তৈরিতে প্রয়োজন হয়, যা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ড্রোনের মতো সামরিক সরঞ্জামেও ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গন্ধকের সরবরাহ ব্যাহত থাকলে ব্যাটারি-নির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
বিবিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন- নিউজরুম এডিটর আবু সাঈদ সজল।