যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পালটা বোমা হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে চরম নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে, জীবন বাঁচাতে অনেক মার্কিন সেনাকে তাদের নির্ধারিত ঘাঁটি ছেড়ে এই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও অফিস ভবনে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্য ও মার্কিন কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিমান হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। সেনারা এখন কাছাকাছি হোটেল ও অফিস থেকে কাজ করছে, যা তাদের নিজেদের এবং বেসামরিক নাগরিক উভয়ের জন্যই বিপদজনক হতে পারে।
ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজের ভূ-অবস্থানভিত্তিক হামলার একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুসারে, ইরান ১০৪টি মার্কিন ও আঞ্চলিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমানের পাইলট এবং বিমান পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ক্রুরা ছাড়া স্থলবাহিনীর বড় একটি অংশ মূলত দূরবর্তী অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে বা তার কাছাকাছি ইরানের হামলার মানচিত্র। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই ছড়িয়ে পড়া মার্কিন সেনাদের খুঁজে বের করার ঘোষণা দিয়েছে এবং তাদের নতুন অবস্থানগুলোর খবর জানাতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এই হুমকি সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে পেন্টাগনের সামরিক অভিযান থেমে নেই। ইরান যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে।
দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, মার্কিন স্যাটেলাইট সংস্থাগুলো অন্তত ১৪ দিন ধরে ছবি প্রকাশে দেরি করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিন্তু দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে, ক্রমাগত হামলার ফলে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে থাকা ১৩টি মার্কিন ঘাঁটির মধ্যে অনেকগুলোই প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা ইরানজুড়ে তাদের সামরিক অবকাঠামোর ৭ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছি।’
তবে সেনাদের এভাবে অস্থায়ী বা বিকল্প অবস্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। কেন্দ্রীয় কমান্ড তাদের মধ্যে কয়েক হাজার সেনাকে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নিয়েছে, এমনকি অনেককে ইউরোপেও পাঠানো হয়েছে। তবে বিশাল একটি অংশ এখনও মধ্যপ্রাচ্যেই অবস্থান করছেন, যদিও তারা তাদের মূল ঘাঁটিগুলোতে নেই।
বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে যুদ্ধ পরিচালনা করা এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর বিশেষ অভিযানের অবসরপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ মাস্টার সার্জেন্ট ওয়েস জে. ব্রায়ান্ট বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের দ্রুত ও অস্থায়ী অপারেশন সেন্টার তৈরি করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু এতে নিশ্চিতভাবেই সক্ষমতা কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি চাইলেই একটি হোটেলের ছাদে সব ধরণের ভারী সরঞ্জাম স্থাপন করতে পারবেন না। এগুলোর অনেকগুলোই বহন করা বা পরিচালনা করা বেশ জটিল।’
তবে একজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেনারা বেসামরিক হোটেলের ছাদে বসে কাজ করছেন না।
ওপেন-সোর্স বিশ্লেষক হিনজের মতে, সবগুলো ঘাঁটির মধ্যে কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটিতেই সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে – মোট ২৩টি। এর পরেই রয়েছে ক্যাম্প আরিফজান এবং ক্যাম্প বুহরিং, যেখানে যথাক্রমে ১৭ এবং ছয়টি ভূ-অবস্থানভিত্তিক হামলা হয়েছে।

কিছু সৈন্যকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।
এই তিনটি ঘাঁটি থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্রে হ্যাঙ্গার, যোগাযোগ পরিকাঠামো, স্যাটেলাইট সরঞ্জাম, জ্বালানির গুদাম এবং – বুধবার (২৫ মার্চ) আলি আল সালেমে হামলার পর – একটি বড় গুদামের ক্ষতি হতে দেখা গেছে।
হিনজের মূল্যায়ন অনুসারে, ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৭ বার, বাহরাইনে ১৬ বার, ইরাকে সাতবার, কাতারে ছয়বার, সৌদি আরবে ছয়বার এবং জর্ডানে দুইবার ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের একটি সমীক্ষায় ধেকা গেছে, যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে চালানো হামলায় কমপক্ষে ৮০০ মিলিয়ন ডলার (৬০০ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ক্ষতি হয়েছিল। যার মধ্যে জর্ডানে অবস্থিত একটি আমেরিকান থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) রাডার এবং এই অঞ্চলের অন্যত্র থাকা অন্যান্য অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা ও ডজনখানেক শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। একই সঙ্গে তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো বিশ্বের মানুষ অনুভব করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান সৈন্যদের ব্যবহৃত ১৩টি সামরিক ঘাঁটির অনেকগুলোই এখন বসবাসের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশ কুয়েতের ঘাঁটিগুলো সম্ভবত সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শোয়াইবা বন্দরে একটি হামলায় সেনাবাহিনীর একটি কৌশলগত অপারেশন সেন্টার ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিমানের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া ক্যাম্প বুহরিং-এর রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাতারে অবস্থিত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক বিমান সদর দফতর আল উদাইদ ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে ইরান, এতে একটি আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাহরাইনে ইরানের একটি ‘অ্যাটাক ড্রোন’ মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরের যোগাযোগ সরঞ্জামে আঘাত হেনেছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বেশ কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরাকের এরবিলে একটি বিলাসবহুল হোটেলে একঝাঁক ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছিল ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। ইরানি কর্মকর্তারা এখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ তুলছেন যে, আমেরিকান সেনাদের হোটেলে রেখে তারা বেসামরিক সাধারণ মানুষকে ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরানি সূত্রগুলো দাবি করেছে, ইরানের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে অত্যাধুনিক খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে পেন্টাগনের এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেছেন যে, ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানিদের ‘এখনো কিছু সক্ষমতা অবশিষ্ট আছে।’
জেনারেল কেইন জানান, পুরো অঞ্চলজুড়ে মোতায়েন করা ‘বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সৈন্য ও স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে, তবে পেন্টাগন এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।