অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের দক্ষিণে নিজের জমিতে কয়েক দশক আগে লাগানো জলপাই গাছগুলো সম্প্রতি কেটে ফেলেছেন ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল রহমান আজ্জাম। তার জন্য এটা ছিল এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। অবৈধ ইসরায়েলি বসতির জন্য রাস্তা নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমিটি বাজেয়াপ্ত করার পর পরই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।
গত ডিসেম্বরে বাজেয়াপ্ত করার জন্য নির্ধারিত জমিটির পরিমাণ ৫১৩ ডুনামেরও (৫১.৩ হেক্টর) বেশি, যার মধ্যে ৪৫০ ডুনাম শুধু আল-ফানদাকুমিয়া গ্রামের এবং বাকি অংশ সিলাত আদ-ধাহর ও আল-আত্তারার মতো পার্শ্ববর্তী শহরগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
এই বছর ফিলিস্তিনিরা ভূমি দিবসের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করলেও, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং তাদের ভূমিতে, বিশেষ করে ‘এরিয়া সি’-তে, প্রবেশাধিকারের ওপর বিধিনিষেধের মতো চ্যালেঞ্জগুলো অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলি নেতারা ক্রমাগত ঘোষণা করে চলেছেন যে, এটি পরিকল্পিতভাবে করা।
এই বছর ফিলিস্তিনিরা ভূমি দিবসের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করলেও, অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং তাদের ভূমিতে, বিশেষ করে ‘এরিয়া সি’-তে, প্রবেশাধিকারের উপর বিধিনিষেধের মতো চ্যালেঞ্জগুলো অব্যাহত রয়েছে।
১৯৭৬ সালে গ্যালিলিতে হাজার হাজার ডুনাম জমি বাজেয়াপ্ত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ছয়জন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের স্মরণে প্রতি বছর ৩০শে মার্চ পালিত হয় ভূমি দিবস বা ইয়াওম আল-আর্দ। দিনটি ভূমি অধিগ্রহণ এবং “গ্যালিলির ইহুদীকরণ”-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিন।
সেই থেকে এই দিনটি একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমির প্রতি আবেগ এবং তা বাজেয়াপ্ত বিরোধিতার প্রতীক।
শৈশবকাল থেকেই আজ্জাম তার বাবা, দাদা এবং চাচাদের সঙ্গে জলপাই গাছ লাগানো ও জমি চাষ করার কাজ করতেন। ফলে, জমির সঙ্গে তার এক গভীর সংযোগ গড়ে ওঠে। এই ভূমিতে তিনি ২০০২ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। এরপর সেখানে তারসালা নামক অবৈধ ইসরায়েলি বসতি এবং সানুর সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয় এবং তাকে ও তার পরিবারকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
২০০৫ সালের সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনার পর, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শিবির এবং তারসালা বসতি থেকে সরে যায়। তখন আজ্জাম এবং অন্যান্য জমির মালিকরা তাদের জমিতে ফিরে আসেন এবং তাদের আনন্দ ছিল অবর্ণনীয়।
তবে, সাম্প্রতিক ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের পর, ফিলিস্তিনি জমির মালিকদের তাদের জমিতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং এসব জমি এখন সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
‘হঠাৎ আমরা সরকারি সংবাদপত্রে জমির নম্বরটি খুঁজে পেলাম। সঙ্গে ছিল হোমেশ ও তারসালা বসতিকে সংযোগকারী একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য জমি বাজেয়াপ্ত করার একটি আদেশ। ২০০৫ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর আমরা ওই বসতিগুলোতে ফিরে গিয়েছিলাম। আমরা দেখলাম, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এরমধ্যেই বুলডোজার দিয়ে জমি ভাঙা শুরু করে দিয়েছে,আল জাজিরাকে বলছিলেন আজ্জাম ।
বুলডোজার চালানোর সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যাতে তার জলপাই গাছগুলো কেটে ফেলতে না পারে, সেজন্য আজ্জাম নিজের জমিতে গিয়ে নিজেই গাছগুলো কেটে ফেলেন। কাজটি করার সময় তিনি কাঁদছিলেন। এরপর তিনি লক্ষ্য করেন যে, অন্য সব জমির মালিকও একই কাজ করেছেন।
তিনি আরও বলেন,‘সেনাবাহিনী বা বসতি স্থাপনকারীদের চেয়ে আমাদের গাছগুলো আমরাই কেটে ফেলা সহজ। এটা আমাদের জমি, আর গাছগুলো আমাদের সন্তানের মতো; আমরা তাদের খুব যত্ন করি এবং ভালো ব্যবহার করি, কারণ আমরা কঠোর পরিশ্রম করে তাদের চাষ করেছি ও পরিচর্যা করেছি।’
বিভিন্ন উপায়ে জমি বাজেয়াপ্তকরণ
১৯৯৩ সালে ইসরায়েল এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তি পশ্চিম তীরকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে। এলাকা ‘এ’, যা সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম তীরের প্রায় ১৮ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত; এলাকা ‘বি’, যা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি যৌথ নিয়ন্ত্রণে এবং ২২ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত; এবং এলাকা ‘সি’, যা সম্পূর্ণ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে এবং ৬০ শতাংশ নিয়ে গঠিত।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে, ইসরায়েল তার সংযুক্তিকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে পশ্চিম তীরের ‘সি’ এলাকায় ফিলিস্তিনি ভূমি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ জারি করেছে। ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে যে, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই এই পরিকল্পনা এরমধ্যেই বাস্তবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘কমিশন এগেইনস্ট ওয়াল অ্যান্ড সেটেলম্যান্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ২০২৫ সালে সামরিক উদ্দেশ্যে ৯৪টি বাজেয়াপ্তকরণ আদেশের মাধ্যমে ৫,৫৭২ ডুনাম ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করেছে। এর পাশাপাশি তিনটি ভূমি অধিগ্রহণ আদেশ এবং চারটি রাষ্ট্রীয় ভূমি ঘোষণার মাধ্যমেও বাজেয়াপত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, এই আদেশগুলো বিচ্ছিন্ন বা পরিস্থিতির প্রয়োজনে ছিল না, বরং বসতি সম্প্রসারণ, তাদের সীমান্ত সুরক্ষিত করা এবং বসতির জন্য রাস্তা নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভৌগোলিকভাবে দখল করা হয়েছিল, যা ফিলিস্তিনি ভূমিকে আরও খণ্ডিত এবং বিচ্ছিন্ন করেছে।