Saturday 11 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কিছুই অর্জন করতে পারেনি ‘নেতানিয়াহু-বাদ’, ইসরায়েলিদের দিতে হয়েছে চড়া মূল্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০০

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

দশকের পর দশক ধরে নিজেকে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করলেও, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী সামরিক নীতি বা ‘নেতানিয়াহু-বাদ’ ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনো নিরাপত্তা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। গাজা থেকে লেবানন, কিংবা তেহরান প্রতিটি ফ্রন্টে সামরিক শক্তির দম্ভ দেখালেও দিনশেষে তা কেবল রক্তপাত আর বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতাই বাড়িয়েছে। নেতানিয়াহুর এই কৌশল ইসরায়েলিদের কোনো স্থায়ী সুফল দিতে পারেনি; বরং এর বিনিময়ে দেশটিকে দিতে হয়েছে অপূরণীয় চড়া মূল্য।

দ্যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড এমনটিই মনে করেন। প্রতিবেদনটি ভাবানুবাদ সারাবাংলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন

স্বভাবতই ট্রাম্প এই নাটকের প্রধান তারকা। কখনো তিনি রক্তপিপাসু ভাষায় হুমকি দিয়েছেন, ‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’, আবার কখনো নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেছেন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার কথা। কিন্তু এই পুরো সময়ে ট্রাম্পের পাশে এমন এক সঙ্গী ছিলেন, যিনি এখন পাদপ্রদীপের আলোয় আসছেন। তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

পুরো বিশ্ব যখন ভাবছে মধ্যপ্রাচ্যে বন্দুকের গর্জন এবার থামবে, তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যেন সেই বার্তার তোয়াক্কাই করছেন না। ট্রাম্প যখন তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার ঘোষণা দিয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছিলেন, তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরই লেবাননের ওপর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে হত্যা করা হয় অন্তত ৩০৩ জনকে, যাদের বড় একটি অংশই বেসামরিক নাগরিক।

ইসরায়েলের দাবি, ট্রাম্পের চুক্তি লেবাননের জন্য প্রযোজ্য নয়। নেতানিয়াহু এখন দ্বিমুখী চাল চালছেন; একদিকে চাপের মুখে লেবানন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় রাজি হয়েছেন, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দমনের নামে হামলা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছেন।

‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বনাম বাস্তবতা

নেতানিয়াহুকে বিচার করার দুটি পথ আছে; আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত। বিশ্বের চোখে তিনি গাজা ধ্বংসের কারিগর এবং যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু দেশের ভেতরে তার সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী। তবে এখন সেই ভাবমূর্তি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। তার শাসনকালেই ইসরায়েল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার (৭ অক্টোবর ২০২৩) শিকার হয়েছে। যে হামাসকে তিনি ‘সম্পূর্ণ নির্মূল’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুই বছরের নিষ্ঠুর বোমাবর্ষণ আর ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর পরও গাজার বড় অংশে হামাস এখনো বহাল তবিয়তে আছে।

ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি

কেবল গাজা নয়, লেবানন ও ইরানের ক্ষেত্রেও নেতানিয়াহুর হুঙ্কার ফাঁকা প্রমাণিত হয়েছে। গত জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ যে দাবি তিনি করেছিলেন, তা মাত্র আট মাসও টেকেনি। তেহরান আজও ইউরেনিয়ামের মজুদ ধরে রেখেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে (হরমুজ প্রণালী) জিম্মি করার ক্ষমতা দেখাচ্ছে। হিজবুল্লাহর প্রধানকে হত্যা করা হলেও সংগঠনটি আজও ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

সামরিক জয় বনাম রাজনৈতিক নিরাপত্তা

নেতানিয়াহুর মূল দর্শন হলো শত্রুকে আঘাত করো এবং আরও জোরে আঘাত করো। কিন্তু এই পথ কেবল সাময়িক স্বস্তি আনে, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নয়।

ইসরায়েলি বিরোধী নেতা ইয়ার গোলানের ভাষায়, ‘নেতানিয়াহু জানেন না কীভাবে সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে হয়।’ তিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক পথ খোঁজেন না, বরং কেবল আকাশ থেকে বোমা ফেলেই কথা বলতে চান।

একঘরে ইসরায়েল

নেতানিয়াহু-বাদ ইসরায়েলকে নিরাপত্তার বদলে দিয়েছে কেবল মৃত্যু আর বিশ্বজুড়ে একঘরে হওয়ার তকমা। এমনকি গত সপ্তাহে নেসেটে ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের যে বর্ণবাদী আইন পাস করা হয়েছে, তাতেও তিনি সশরীরে উপস্থিত থেকে ভোট দিয়েছেন।

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে হয়তো ভোটাররা এর জবাব দেবেন। দশকের পর দশক ধরে সামরিক শক্তির দাপট দেখিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে ভুল কৌশল তিনি অনুসরণ করেছেন, তার ফলাফল এখন সবার সামনে পরিষ্কার। সম্ভবত ইসরায়েলিরা এখন এই সত্যটি শোনার জন্য প্রস্তুত যে নিরাপত্তা কেবল শক্তি দিয়ে আসে না, বরং এর জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর