Wednesday 06 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভাব’
ভারতীয় রাজনীতির ‘লৌহ মানবী’ মমতা ব্যানার্জী যেভাবে বাংলা হারালেন

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
৫ মে ২০২৬ ১৩:৩০ | আপডেট: ৫ মে ২০২৬ ১৫:১০

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: এএনআই

নয়াদিল্লির গৃহকর্মী সীমা দাস, প্রাদেশিক নির্বাচনে সময়মতো ভোট দেওয়ার জন্য ট্রেন বদল করে দু’দিনের যাত্রায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নিজের গ্রামে পৌঁছেছেন। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এর আগে সবসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-কে ভোট দিতেন। কিন্তু এবার তার ইচ্ছা ভিন্ন কারণ তার শাশুড়ি তাকে বুঝিয়েছেন যে দিদি‘মুসলিমদের পক্ষ নিয়েছেন’।

সীমা আরও বলেন, ‘দিদি পথভ্রষ্ট হয়েছেন এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য কেবল মুসলমানদের তোষামোদী করছেন।’

সীমা দাসের এই অভিযোগ ভারতীয় রাজনীতির এমন এক দিককে তুলে ধরেছে যেখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ঐতিহাসিক ‘হেজিমোনিক পাওয়ার’ বা ‘আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভাব’। এই ধরনের আধিপত্য বিজেপির ক্ষমতা একীকরণের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শক্তির নেতৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ এবং আনুগত্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিন ধরে টিএমসি-র বিরুদ্ধে এই আধিপত্যের প্রক্রিয়া (হেজিমোনিক মেকানিজম) করে আসছে। এবং তারা ভারতের সাধারণ জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে টিএমসি আসলে ধর্মীয় বহুত্ববাদ এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার ওপর জোর দেয়।

বিজ্ঞাপন

মমতা ব্যানার্জী ‘বহিরাগত’ বিজেপির কাছে যেভাবে বাংলা হারালেন

মমতা ব্যানার্জী-পুরুষশাসিত রাজনীতিতে সাদা শাড়ি পরিধানকারী এমন একজন নারী যিনি লড়াকু এবং বিজেপির সবচেয়ে বড় দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধক। তিনি এমন একজন রাজনৈতিক নেত্রী যিনি টানা তিনবার সরকার-বিরোধী মনোভাব এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আক্রমণাত্মক প্রচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। কিন্তু ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভাগ্য এবং দৃশ্যত জনগণের রায় তার পক্ষে ছিল না।

হিন্দুস্থান টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ১৫ বছর ধরে মমতা ব্যানার্জী এবং তার দল ৯০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের এই রাজ্য শাসন করে আসছে। যদিও বিজেপি এমন একটি রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে কিন্তু তারপরও তারা ঐতিহ্যগতভাবে এই রাজ্যে একটি প্রান্তিক দল বলে ধারণা করা হতো। তবে গত সোমবার (৪ এপ্রিল) সেই চিত্র পাল্টে গেল। বদলে গেল সব হিসাব নিকাশ। যেখানে দলটি আগে কখনও জয়লাভ করেনি সেই মোদীর দল পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।

সোমবার ভারতের স্থানীয় সময় ৪:৩০ নাগাদ ঘোষণা করা ফলাফরে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০০টি আসন। অন্যদিকে, ব্যানার্জির টিএমসি মাত্র ৮৭টি আসন জিতেছিল।

সমর্থকদের কাছে ‘দিদি’ নামে পরিচিত টিএমসি প্রধান টানা চতুর্থবারের মতো তার দুর্গটি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা অবশেষে বিজেপির নাগালের মধ্যে চলে গেছে। মমতা ব্যানার্জী শুধু যে পশ্চিমবঙ্গকে তারই চোখে বহিরাগত একটি দলের কাছে হারালেন তাই নয়, তিনি তার শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরও হারালেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। এই শুভেন্দুই একসময় ছিলেন মমতার প্রাক্তন ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং এই আসন থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

ভোট দেওয়ার পর একজন ভোটার আঙুলে লাগানো কালি দেখাচ্ছেন। ছবি: এএফপি

ব্যানার্জী দূর্গের ভেতর ফাটল ধরল কিভাবে?

চেন্নাইয়ের শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কর্মরত রাহুল ভার্মা আল জাজিরাকে বলেন,‘মমতার প্রতি দৃশ্যমান সমর্থন রয়েছে এবং তিনি জনপ্রিয়ই আছেন। কিন্তু টিএমসি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী মনোভাব রয়েছে এবং দৈনন্দিন জীবনে তাদের হস্তক্ষেপে মানুষ খুশি ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, বিজেপি এবার আরও ভালোভাবে প্রচার চালিয়েছে এবং এই ফলাফলে তিনি ‘বিস্মিত’ নন। কারণ যদিও বিজেপির জন্য এটি একটি কঠিন নির্বাচন ছিল, কিন্তু অসম্ভব ছিল না।

ভার্মার মতে, ‘তাদের জন্য [পশ্চিমবঙ্গে] একটি করিডোর খোলা ছিল, এবং এখন বলা যায় যে সবকিছু এমনভাবে মিলে গিয়েছিল যাতে তাদের জন্য এই ফলাফল খুব সহজেই তৈরি হয়। প্রবল সরকারবিরোধী মনোভাব না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ এই ধরনের ফলাফল পেত না।’

নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছেন, যা প্রায় ৯২.৯৩ শতাংশ, এবং এটি রাজ্যের জন্য একটি রেকর্ড।

নয়াদিল্লির ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ’-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবীণ রায় বলেছেন, ব্যানার্জির দল ‘ভোটারদের নতুন কিছু দিতে এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা তীব্র সরকার-বিরোধী মনোভাবকে পরাস্ত করতে’ ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘যারা তাদের আদর্শে বিশ্বাসী নন, দলীয় ব্যবস্থা তাদের প্রতি বৈরী হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে টিএমসি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।’

রায় আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে এই পরাজয় মোদীর পদের জন্য জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ব্যানার্জির আশাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।’

তবে তিনি বলেন, ১এই ফলাফলের প্রভাব ব্যানার্জির বাইরেও বিস্তৃত। বিজেপির জয় এবং টিএমসির নাটকীয় পরাজয়, সব দলের রাজনৈতিক পুঁজি হ্রাস করবে।’

দুই বছর আগের তুলনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে মোদীর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয়েছিল, ফলে টিকে থাকার জন্য দলটিকে মিত্রদের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়েছিল। রায় বলেন, সোমবারের এই জয় জাতীয় ভোটে হওয়া ‘নির্বাচনি ধাক্কা পুষিয়ে দিয়েছে’।

রায় আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি মোদীর নেতৃত্বের জাতীয় অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং ভারত শাসন করার ক্ষেত্রে দলটির [বিজেপি] আধিপত্যবাদী ক্ষমতাকে প্রসারিত করে।’

বিজেপি হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের ওপর ভর করে প্রচার চালিয়েছে

নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর সিনিয়র ফেলো নীলঞ্জন সরকার, যিনি নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভ্রমণ করেছিলেন, আল জাজিরাকে বলেন যে তার দল ভোটারদের পছন্দের মধ্যে একটি বড় শহর-গ্রামের ব্যবধান চিহ্নিত করেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি শহরের পুরুষরা খুব বেশি মেরুকৃত। বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যার একটি বড় অংশই গ্রামে, এবং এই মেরুকরণের মাত্রা বিবেচনা করলে, ফলাফলটি বিজেপির জন্য একটি বড় ব্যবধান তৈরি করেছে।’

ঐতিহাসিকভাবে, নির্বাচন বিশ্লেষকরা যুক্তি দিয়ে এসেছেন যে বিজেপির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে দলটির জেতার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। রাজ্যের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি মুসলিম। তবে নীলঞ্জন বলেন, ‘অবশ্যই, এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি, যা আমরা আমাদের গবেষণার সময় লক্ষ্য করেছি।’

বিজেপি নিজেদেরকে হিন্দু ভোটারদের দল হিসেবে তুলে ধরতে দ্বিধা করেনি। রাজ্যে বিজেপির নেতা এবং সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘হিন্দুদের ভোট একত্রিত হয়েছে।’

তবে তিনি দাবি করেছেন যে, আগের মতো অনেক মুসলমানও ব্যানার্জীর টিএমসিকে ভোট দেননি এবং বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন।