মার্কিন কংগ্রেসের নির্দলীয় বাজেট গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও)জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন (৩ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার। এ খরচ প্রতি মাসে আরও ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলার করে বাড়তে পারে বলে তারা আভাস দিয়েছে। অজনপ্রিয় এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় ধরণের চাপের মুখে পড়েছে। যুদ্ধের খরচের সঙ্গে জনগণের জীবনযাপন ব্যয়ের সামর্থ্যের বিষয়টি যুক্ত করার চেষ্টা করছে সরকার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিন বছরের বেশি সময় পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সুদের হার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে ভবিষ্যতে সুদের হার আরও বাড়ানো হতে পারে এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা।
বুধবার তেহরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আরেকটি নতুন অস্ত্রের কথা প্রকাশ করেছে। মজার বিষয় হলো, এটি কোনো প্রথাগত অস্ত্র নয় বরং এটি একটি গণিত সমীকরণ।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, এই গাণিতিক অস্ত্রের সঙ্গে মার্কিন সুদের হার বাড়ার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা? ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারকে প্রভাবিত করেছে?
গালিবফের গাণিতিক ক্ষেপণাস্ত্র
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় প্রধান আলোচক হিসেবেও ভূমিকা রাখা ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামরিক অস্ত্রের বদলে অর্থনীতির একটি সমীকরণকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে লক্ষ্য করে তিনি ‘টেইলর রুলের’ আদলে একটি ব্যঙ্গাত্মক সূত্র প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই গাণিতিক সূত্রটি ব্যবহার করে থাকে।
যুদ্ধকালীন বার্তা সম্বলিত ‘এক্স’ এর একটি পোস্টে (X)-এর এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দেখা যাক, সুদের হার বৃদ্ধি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে কিনা? কিংবা এক ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হয় কি না?’ এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন সুদের হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া গেলেও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট তা দিয়ে সমাধান করা যাবে না।
তিনি আরও লিখেছেন, ‘কোনো চোকপয়েন্ট বা কৌশলগত সংকীর্ণ জলপথের ক্ষেত্রে ২৫ বেসিস পয়েন্ট (সুদের হার বৃদ্ধির সাধারণ পরিমাপ) কোনো কাজে আসে না। এটি হলো হরমুজ প্রণালি-কেন্দ্রিক রিস্ক প্রিমিয়াম (ঝুঁকিজনিত বাড়তি খরচ), আর এটি আমরাই নির্ধারণ করি।’
গালিবাফ প্রচলিত টেলর রুলকে পরিবর্তন করে তার নিজস্ব ‘হরমুজ টেইলর রুলে’ উপস্থাপন করেছেন। এতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেবের মতো সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ নৌপথের ঝুঁকিকেও যুক্ত করা হয়েছে।
এখানে, উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গালিবাফের সেই পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ বেঞ্চমার্ক সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে দেয়। তাদের নীতি সুদের হার নীতি সুদ ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিসর থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশ করা হয়।

হরমুজ প্রণালি। রয়টার্স।
টেইলর রুল কি?
আমেরিকান অর্থনীতিবিদ জন বি. টেলর ১৯৯৩ সালে এই নিয়মটি প্রবর্তন করেন। এটি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক সূত্র, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে (যেমন-যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ) নির্দেশ দেয় যে মুদ্রাস্ফীতি কম রাখতে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে তাদের কীভাবে স্বল্পমেয়াদী সুদের হার নির্ধারণ করা উচিত।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল ফান্ডস রেট’-এর (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার) সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি এবং ‘আউটপুট গ্যাপ’ বা উৎপাদন-ব্যবধানের (অর্থাৎ প্রকৃত অর্থনৈতিক উৎপাদন ও সম্ভাব্য উৎপাদনের মধ্যকার পার্থক্য) সম্পর্ক স্থাপন করে।
সবচেয়ে সহজভাবে বলতে গেলে, সূত্রটি হলো:
সুদের হার = মুদ্রাস্ফীতি + ০.৫ (আউটপুট গ্যাপ) + ০.৫ (মুদ্রাস্ফীতি − ২%) + ২%।
এর অর্থ হলো, মুদ্রাস্ফীতি যখন ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে যায় অথবা অর্থনৈতিক উৎপাদন যখন তার সম্ভাব্য মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সুপারিশকৃত সুদের হারও বৃদ্ধি পায়। আবার মুদ্রাস্ফীতি কমে গেলে কিংবা অর্থনীতি যখন তার সম্ভাব্য সক্ষমতার চেয়ে কম মাত্রায় পরিচালিত হয়, তখন এই হার কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধির পেছনে কি ইরান যুদ্ধের কোনো ভূমিকা আছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের প্রসারের সঙ্গে জড়িত বিপুল বিনিয়োগ—এসব মিলিয়েই মূল্যস্ফীতির চাপকে জোরালো করে রেখেছে।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট (০.২৫ শতাংশ) বাড়িয়েছে; গত তিন বছরের মধ্যে এটিই ছিল সুদের হার বৃদ্ধির প্রথম ঘটনা।
সুদের হার বাড়ানোর পর দেওয়া এক বক্তব্যে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের জেরে পেট্রোলের দাম বেড়ে গেছে, যা ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তাদের সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।’
ওয়ার্শ বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন উত্তপ্ত পরিস্থিতি বা সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোর প্রভাব এড়ানোর কোনো উপায় নেই।’
আইজি গ্রুপের বোচ্যাম্প বলেন, ‘পরোক্ষভাবে হলেও, ইরানের সঙ্গে সংঘাতই গত রাতের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে-যদিও কেউ তা স্বীকার করতে চাইছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানির দামের আকস্মিক বৃদ্ধি এবং বন্ডের ইল্ড বা আয়ের হার বেড়ে যাওয়া—এই দুইয়ের প্রভাবে ফেডারেল রিজার্ভ এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো পথ নেই।’
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার বলেন, ‘এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের পালটা পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাসকে ত্বরান্বিত করেছে।’
তিনি বলেন, ‘চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য নিশ্চিতভাবেই সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। ছবি: রয়টার্স
ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নির্ধারণ করছে?
সংক্ষেপে উত্তর হলো-না।
ওয়েলথ ক্লাব’-এর স্ট্রিটার সতর্ক করে বলেছেন, ‘যদিও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং তেলের দাম বৃদ্ধি ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলেছে, তবে এগুলোই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ছিল না।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিশাল কোম্পানিগুলোর বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও অর্থনীতির মূল ধারায় প্রভাব ফেলেছে। এর পাশাপাশি শক্তিশালী মূলধনী বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীল চাহিদা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। তাই নীতিনির্ধারকরা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতিকে চাপে ফেলতে কিছু বিষয়ের ওপর-বিশেষ করে তেল সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাবের মাধ্যমে-তেহরানের হয়তো কিছুটা ভূমিকা রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার ‘নির্ধারণ’ করছে না।’
স্ট্রিটার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ অনেক বিস্তৃত পরিসরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের কর্মকাণ্ড মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসকে প্রভাবিত করেছে বটে, তবে সুদের হার কত হবে—সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফেডারেল রিজার্ভেরই। এছাড়া নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও অনেক ধরনের তথ্য-উপাত্ত বিবেচনা করে থাকেন।’
গালিবাফের গাণিতিক উপহাসের নেপথ্যে কী?
ওয়াশিংটন ডিসি-র ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র সিনিয়র ফেলো নেগার মুর্তাজাবি বলেন, ‘গালিবাফের মূল বক্তব্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধি হরমুজ প্রণালিকে পুনরায় খুলে দিতে পারবে না কিংবা ব্যাহত তেল সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারবে না। তার পরিবর্তিত ‘টেইলর রুল’ যা সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত—সেখানে তিনি হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির বিষয়টিকেও তিনি যুক্ত করেছেন। তিনি ফেডারেল রিজার্ভের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে যুক্তি দিয়েছেন যে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব আংশিকভাবে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল-যে বিষয়ে তেহরান প্রভাব ফেলতে সক্ষম।’
মুর্তাজাবি আরও বলেন, সুদের হার নির্ধারণের কোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাবের চেয়ে বরং ইরানের হাতে থাকা দরকষাকষির ক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরাই ছিল গালিবাফের এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।
গত মাসে গালিবাফ একটি গ্রাফিক পোস্ট করেন যাতে লেখা ছিল ‘মেক আমেরিকা হাংরি এগেইন’ (আমেরিকাকে আবারও ক্ষুধার্ত করো)-যা ট্রাম্পের স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ। এর সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষুধা বিষয়ক পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা দাবি দিয়ে পরাজয় আড়াল করা যায় না।’
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সংঘাত শুরু করেছিল, তার শুরুর দিকে গালিবাফ প্রায়ই আর্থিক যুক্তি তুলে ধরতেন। এর মাধ্যমে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সংঘাত পরিচালনার ধরন নিয়ে ব্যঙ্গ করতেন এবং বোঝাতে চাইতেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশল পরিবর্তন না করলে ইরান তাদের ওপর অর্থনৈতিক আঘাত হানতে সক্ষম।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের পক্ষ থেকে এটি এক চমৎকার প্রচারণামূলক কৌশল। ২০২৬ সাল নাগাদ অন্য কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য আসুক বা না আসুক, নিজেদের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোভাবেই উত্যক্ত বা চাপে ফেলার যে সক্ষমতা ইরান দেখিয়েছে, তা অনস্বীকার্য।’