ব্রাজিলের প্রবীণ বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নির্বাচনে নাটকীয় জয় পেয়েছেন। কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে তিনি ঐতিহাসিকভাবে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোট গণনা শেষে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করলে সাও পাওলোর রাস্তায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, ৮০ বছর বয়সী এই বামপন্থী নেতা পেয়েছেন ৫১.৭৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে তার ৪৫ বছর বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৪৮.২৫ শতাংশ ভোট।
ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর লুলার অন্যতম প্রধান মিত্র রেজিনাল্ডো লোপেস দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। এর মাধ্যমে ব্রাজিল বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে কট্টর ডানপন্থীরা হলো ফ্যাসিবাদী। তারা কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে, গরিবদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং সমকামীদের বিরুদ্ধে। আমরা এই দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে নতুন করে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছি।’

লুলার জয়ে আনন্দে কাঁদছেন তার ভোটাররা। গেটি ইমেজেস।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, লুলা ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে পুনরায় এই দায়িত্বে রয়েছেন।
তবে রোববারের রান-অফ নির্বাচনে তার জয়ের পথটি সহজ ছিল না। ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে বোলসোনারো লুলাকে পরাজিত করেছিলেন। তখন অনেকেই মনে করেননি যে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে লুলার পক্ষে ফলাফল উলটে দেওয়া সম্ভব হবে।
এই বামপন্থী নেতা তার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার মাধ্যমেই এই বিশাল ব্যবধান গড়ে তুলেছেন। তার মিত্ররা এটিকেই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।
প্রথম ধাপে ভোট না দেওয়ার হার ছিল রেকর্ড ২১.০৮ শতাংশ। এর ফলে লুলার ভোটাররাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, কারণ তারা ভোটকেন্দ্র থেকে বেশ দূরে থাকেন। তবে দ্বিতীয় ধাপে ভোট না দেওয়ার এই হার কমে ১৯.২১ শতাংশে নেমে আসে।
প্রথম দফার নির্বাচনে পরাজয়ের পর, রাজপথে বিক্ষোভ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে লুলা তার নির্বাচনি প্রচারে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন।

সমর্থকদের উল্লাস। গেটি ইমেজেস।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) লুলার সমর্থকেরা দুটি বিশাল শোডাউন করেন। রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকতে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। এর চেয়েও বেশি মানুষ সাও পাওলোর প্রাণকেন্দ্র পাওলিস্তা অ্যাভিনিউতে মিছিল করেন।
পেশাগত জীবনে একসময় ধাতু শ্রমিক হিসেবে কাজ করা লুলা ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর থেকেই ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। তবে ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন লুলা।রাজনীতিতে আসার পর ১৯৮৯, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ সালে টানা তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ২০০২ সালে তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা প্রথম প্রেসিডেন্ট।

ছবি: রয়টার্স।
লুলার এই জয় বলসোনারোর জন্য একটি দুঃসংবাদ। তিনি এখন ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তিনি আশা করেছিলেন যে ছেলে জিতলে তিনি হয়তো মুক্তি পাবেন এবং সরকারে কোনো পদ পাবেন।
৫ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে তার নতুন মেয়াদ শুরু হবে। দেশে ও বিদেশে নানা বড় সীমাবদ্ধতা তার সামনে তৈরি করেছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈরী মনোভাব। লুলার জয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও একটি বড় ধাক্কা। কারণ তিনি বলসোনারো পরিবারের মিত্র। ট্রাম্প আশা করেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় তার সমর্থক নেতাদের তালিকায় বলসোনারোও যুক্ত হবেন।