Wednesday 07 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গুম কমিশনের সংবাদ সম্মেলন
৪০টি ডিটেনশন সেন্টারের ২৩টিই র‌্যাবের

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:১৭ | আপডেট: ৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:২৪

গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সংবাদ সম্মেলন।

ঢাকা: সারাদেশে ছোট বড় অনেকগুলো আয়না ঘর বা টর্চার সেল অথবা ডিটেনশন সেন্টার মিললেও শুধুমাত্র র‌্যাব ও পুলিশেরই ৪০টি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। এরমধ্যেই ২৩টিই র‌্যাবের ডিটেনশন সেন্টার বলে দাবি করেছে কমিশন।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে কমিশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী লিখিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন। এরপর এক প্রশ্নোত্তরে ডিটেনশন সেন্টারের তথ্য দেন।

এতে কমিশনের সদস্য মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘র‌্যাব-পুলিশের ৪০টি ভয়ংকর মাত্রার ডিটেনশন সেন্টারের সন্ধান পাওয়া যায়। এরমধ্যে ২৩টি র‌্যাবের ডিটেনশন সেন্টার। যেগুলো ব্যাটালিয়ন অফিসে সংযুক্ত ছিল। আর বাকি ১৭টি পুলিশের ডিটেনশন সেন্টার ছিল। এগুলো কমিশন সরেজমিনে তদন্ত করেছে। অনেকগুলো ডিটেনশন সেন্টারের আলামত ধ্বংস করেছে। আমরা যেগুলো যে অবস্থায় পেয়েছি সেগুলো ওই অবস্থায় রাখতে বলেছি, চিঠি দিয়েছি। পরবর্তীতে তদারকি করেছি। ওগুলো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

প্রশ্নোত্তর পর্বে কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে ডিজিএফআই ও এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি এবং আর্মড ফোর্সেস ও পুলিশ লাইন্সের ডিটেনশন সেন্টার রয়েছে। আমরা এসব ডিটেনশন সেন্টার যেখানে যে অবস্থায় পেয়েছি সেগুলো সে অবস্থাতেই রাখতে নির্দেশনা দিয়েছি। আলামত ধ্বংসে সবাই তৎপর ছিল। নির্দেশনার পর আর কেই আলামত ধ্বংস করেনি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করা হয়েছে তা যেন আর কোনোদিন ফিরে না আসে প্রতিবেদনে সেই সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে যা করার তাই করেছেন। এসব যেন আর ফিরে না আসে আগামীতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কমিশন শুধু অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিয়েছে। বাকি কাজ করবে আইসিসির তদন্ত সংস্থা। আর বিচারের কাজ করবে আইসিসি ট্রাইব্যুনাল।’

‘কমিশনে দাখিল হওয়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দায়ের হওয়া ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক ইনকোয়ারির পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল যার মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ (যাদের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি) এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাতকার নেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলেও তাতে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক প্রথম দফায় ১০৫২ জন ও দ্বিতীয় দফায় ৩২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা কমিশন প্রাপ্ত হলেও তা যাচাই এর পর গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণশুনানি আয়োজনের বিষয়ে সুধিজনের পরামর্শ পাওয়া গেলেও, ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জীবন, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় কমিশন গোপনীয়ভাবে জবানবন্দী গ্রহণকেই ন্যায়বিচারের জন্য অধিকতর সমীচীন বলে মনে করেছে।’

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১০এ অনুযায়ী গুম সংক্রান্ত অভিযোগগুলোর মধ্য থেকে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের নিকট পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৃথকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

‘নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, পিক-আপ প্রেস, আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্রেস পরিদর্শন করেছে। মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান পাওয়া গেছে যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ সুরতহাল প্রতিবেদনে এটি প্রমাণিত যে দাফনকৃত লাশের মাথায় গুলি এবং দুই হাত পিছমোড়া করে বাধা অবস্থায় ছিল। এ ছাড়াও বরিশালের বলেশ্বর নদীতে এবং বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং প্লেসের। সন্ধান পাওয়া গেছে। বরিশালে দুটি দেহ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন এ কাজের সূচনা করে এবং অজ্ঞাত মরদেহের ছবি ব্যবহারে আজুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। কমিশন অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্ত করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘কমিশন ঘুমের ভিকটিম ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের অধিক বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং বেশ কিছু প্রেস ব্রিফিং এর আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালযের মাধ্যমে গুমবিষয়ক এক ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। কমিশন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থেকেছে; সবাই ঘুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন।’

‘কমিশন এর আগে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। যেখানে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওযার সুপারিশ করা হয়েছে। পুনরাবৃত্তি রোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন অ্যানফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ প্রণয়নে সহায়তা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কমিশনের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন্স আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সকল বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

ঢাকার বাতাস আজও অস্বাস্থ্যকর
৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৫

আরো

সম্পর্কিত খবর