Wednesday 07 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফেলানী হত্যা
এখনো আদালতে ঝুলছে বিচার, অথচ পিপি বাগিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৫৪ | আপডেট: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৩

ফেলানী হত্যা মামলার পিপি এস এম আব্রাহাম লিংকন। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। ভারতের কুচবিহার থেকে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফিরছিলেন কিশোরী ফেলানী খাতুন (১৫)। কিন্তু সীমান্তে পৌঁছতেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ’র বুলেট শরীর ভেদ করে তার। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণহীন নিস্তেজ শরীর এলিয়ে পড়ে মাটিতে। তারপর ফেলানীর মরদেহ বিএসএফ ঝুলিয়ে দেয় কাঁটাতারের সঙ্গে। দীর্ঘ সময় সেখানে ঝুলতে থাকে ফেলানীর দেহ। যেন ফেলানী নয়, ঝুলছিল বাংলাদেশ।

সেই ফেলানী হত্যার ১৪ বছর পার হলো। কিন্তু এখনো বিচার পেল না তার বাবা নুরু ইসলাম নুরু, বিচার পেল না বাংলাদেশ। অথচ মামলার আসামি অমিয় ঘোষ খালাস পেয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ফেলানী হত্যা মামলায় বাংলাদেশ পক্ষের আইনজীবী কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের সাবেক পি পি এস এম আব্রাহাম লিংকন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ ও ‘একুশে পদক’ বাগিয়ে নিয়ে বসে আছেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে আলোচিত ফেলানী হত্যা মামলায় সুবিচার পাবেন বলে এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন তার বাবা নুর ইসলাম নুরু। ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন সরকারের কাছে আশা করেছিলেন যে, ফেলানী হত্যার নতুন করে কিছু একটা ঘটবে। কিন্তু সেই আশাতেও গুঁড়েবালি। ফেলানীর বাবা সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিবছর ৭ জানুয়ারি ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী এলে কিছু সাংবাদিক ফোন করে, ইন্টারভিউ নেয়। টেলিভিশনে দেখায়, পত্র-পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়। সেই পর্যন্তই থাকে। কিন্তু এভাবে আমি বছরের পর বছর পার করছি। তবুও মেয়ে হত্যার বিচার পাচ্ছি না।’

নুরু অভিযোগ করে বলেন, ‘ফেলানী হত্যা মামলায় কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের সাবেক পিপি এস এম আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে ভারতের কলকাতায় গিয়েছিলাম। তিনি ওই মামলায় তেমন কিছুই বলেনি। যার কারণে অমিয় ঘোষ খালাস পায়। আর পিপি পায় বাংলাদেশে স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক। কেমনে কী হলো বুঝতে পারি নাই। কেউ বলেন, ভারতীয় পরামর্শে পুরস্কার পান তিনি, আবার কেউ বলেন- দেশের জন্য তার বিভিন্ন অবদানের কারণে পুরস্কার পেয়েছেন।’

ফেলানীর বাবা বলেন, ‘বেনাপোল দিয়ে ভারতে যাওয়ার আগে বিজিবি হেল্প করেছে। যাতায়াতের টাকা সরকারের তরফ থেকে দেওয়ার কথা থাকলেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ টাকা দিয়েছিল। তৎকালীন পিপি আব্রাহাম লিংকন ও আমার যাতায়াতের টাকার পাশাপাশি যত ধরনের সহযোগিতা করা লাগে তার সবই করেছে বিজিবি।’

বিজিবি কী কারণে ফেলানীর বাবা ও আইনজীবীকে টাকা পরিশোধ করেছিল? তা জানতে বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলামকে অবহিত করা হয়। এর চার দিন পরেও তিনি কোনো উত্তর জানাতে পারেননি। তবে বিজিবির একটি সূত্র বলেছে, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বিজিবিকে নির্দেশ দেওয়া হলে কলকাতায় যাতায়াতের সবখরচ বিজিবি বহন করে। এমনকি অন্যান্য যতধরনের সহযোগিতা করা লাগে সেগুলোও করেছে বিজিবি। তবে বিষয়টি নিয়মবহির্ভুত হওয়ায় তার কোনো রেকর্ড রাখেনি বাহিনীটি।’ সূত্র আরও বলছে, ‘কথিত আছে যে, আব্রাহাম লিংকনকে ভারতের পরামর্শেই একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।’

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগের সরকার কিন্তু বিচার করতে পারত, কিন্তু করে নাই। নতুন যে সরকার আছে, তাদের কাছে দাবি, বিচারটা যাতে আন্তর্জাতিক আদালতে করে দেয়; সে ব্যাপারে যাতে বাংলাদেশ সরকার তদবির করে।’ মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস এম আব্রাহাম লিংকন সমাজসেবায় অবদানের জন্য ২০২৪ স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন, যা দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। এছাড়া, তিনি সমাজসেবা, আইন, গবেষণা ও লেখক হিসেবে তার বহুমুখী কাজের স্বীকৃতি ২০২২ সালে একুশে পদকও পান।

ওই সুত্রটি আরও জানায়, আব্রাহাম লিংকন কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। সেইসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যসহ সরকারি বেসরকারি নানান পদে আসীন ছিলেন। তিনি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করতেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গেও তার সবসময় সখ্যতা ছিল।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ফেলানীকে হত্যার দুই বছর পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফ’র বিশেষ কোর্টে শুরু হয় এ হত্যাকাণ্ডের বিচার। ফেলানীর বাবা ও মামার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। রায় প্রত্যাখান করে পুনরায় বিচার দাবি করে ফেলানীর বাবা আবেদন করলে ২০১৪ সালে ফের বিচার শুরু হয়। ওই বিচারের রায়ে ২০১৭ সালের ১৭ নভেম্বর অভিযুক্ত দ্বিতীয়বারের মতো খালাস পান। পরে ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) মানবাধিকারকর্মী কিটি রায় ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। এর পর বারবার শুনানির তারিখ পিছিয়ে সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি নতুন দিন ধার্য হলেও, সেদিন আর তা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের মানবাধিকারকর্মী কিটি রায় ১ জানুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপে সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফেলানী হত্যা ইতিহাসের বর্বরোচিত একটি হত্যাকাণ্ড। এর দায় ভারত সরকার ও অমিয় ঘোষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কিন্তু বিএসএফ’র স্পেশাল কোর্ট এই মামলাকে আমলে নেয়নি। বিচারকাজও ছিল প্রহসনমূলক ও একতরফা। আমরা ন্যায়বিচার চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছি। কিন্তু এরপরেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও সরকার তা আমলে নেয়নি।’

এদিকে ফেলানী হত্যার বিচার না পাওয়া ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা দায়রা জজ আদালতের একাধিক আইনজীবী আব্রাহাম লিংকনের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ‍দুয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফেলানী হত্যার বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ও আবেগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এস এম আব্রাহাম লিংকন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ায় কিছু মানুষ ধরে নেয় যে, তিনি খালাসে ভূমিকা রেখেছেন বা এর বিনিময়ে পুরস্কার পেয়েছেন।’

আরেক আইনজীবী বলেন, ‘অপরাধটি কোথায় ঘটেছে, এটাই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। ফেলানী নিহত হন ভারতের ভূ-খণ্ডে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের ভেতর দিকে। আন্তর্জাতিক আইনের মূল নীতি হলো টেরিটোরিয়াল জুরিডিকশন । যে দেশের ভূখণ্ডে অপরাধ ঘটে, বিচার করার অধিকার মূলত সেই দেশেরই। ফলে বাংলাদেশের আদালত সরাসরি এই হত্যার বিচার করতে পারে না। বিচার করার ক্ষমতা থাকে ভারতের। অভিযুক্ত একজন বিদেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। বিএসএফ একটি সশস্ত্র বাহিনী, তাই তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা সাধারণ ফৌজদারি আদালতে না গিয়ে অনেক সময় সামরিক আইন বা অভ্যন্তরীণ বাহিনী আদালতের মাধ্যমে বিচার হয়।’

এ বিষয়ে এস এম আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার নম্বরে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এর পর সারাবাংলা ডটনেটের কুড়িগ্রাম করেসপন্ডেন্টের জাহিদুর রহমানের মাধ্যমে তার খোঁজ করা হয়। কিন্তু জাহিদুর রহমানও এক সপ্তাহে আব্রাহামের কোনো খোঁজ পাননি। তিনি কোথায় থাকেন তাও কেউ বলতে পারেন না। আদালতেও আসেন না, এমনকি তার নিজের হাতে গড়ে তোলা আইন কলেজেও আসেন না। তবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বেশ কয়েকজন জানান, আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে পলাতক আছেন। তিনি পার্শ্ববর্তী একটি দেশে আছেন। তার নামে কোনো মামলা না থাকলেও নিজেই পালিয়ে আছেন।

কী করতে পারে বাংলাদেশ

ফেলানী হত্যার বিচারে কূটনৈতিক প্রতিবাদ, নোট ভার্বাল পাঠানো, আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তোলা এবং পুনর্বিচারের অনুরোধ করতে পারে বাংলাদেশে। যার কোনোটিই করা হয়নি। কারণ হিসেবে জানা যায়, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই, যেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যকে এভাবে হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক।

আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার পথও কঠিন

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী আজিজুল ইসলাম বলেন সারাবাংলাকে, ‘আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া যেত না। কারণ, বাস্তবতা হলো ব্যক্তি হত্যার মামলা সরাসরি আন্তর্জাতিক আদালতে যায় না। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আবেদন করতে হয়। ফেলানী হত্যা মর্মান্তিক হলেও এটি একক সীমান্ত হত্যাকাণ্ড। এটি আইসিসির আওতায় পড়ে না। আইসিজেতে নিতে হলে ভারতকে রাষ্ট্র হিসেবে দায়ী প্রমাণ করতে হতো, যা রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।’

প্রমাণ ও সাক্ষ্যের সীমাবদ্ধতা

ফেলানী হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ভারতের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়। প্রমাণ সংগ্রহ করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তদন্তে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পায়নি। সাক্ষী হাজির করতে দেওয়া হয়নি। ফলে বিচার হয়েছে একতরফা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।

বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর