রংপুর: এলপিজি মালিক সমিতির ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুচরা বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন রান্নার কাজ থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসা—সবখানেই দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ভোক্তারা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
রংপুরের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৩০৬ টাকা হলেও বাস্তবে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ এই অতিরিক্ত দাম আদায় করছে। এ চিত্র শুধু রংপুরে নয়, সারাদেশেই প্রায় একই রকম।
রংপুরের কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা মিম আক্তার শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকাল থেকে একাধিক দোকানে যোগাযোগ করেও এলপিজি পাননি। বিকেলে এক দোকানি পাশের দোকান থেকে সিলিন্ডার এনে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও অগ্রিম ২ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। এক ঘণ্টা পর আরও ৩০০ টাকা দাবি করা হলে মোট ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার নিতে বাধ্য হন তিনি।
মিম আক্তার বলেন, ‘রান্না বন্ধ রাখার উপায় নেই। বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত টাকা দিয়েছি। এভাবে জিম্মি করে দাম আদায় করা একেবারেই অন্যায়।’
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান বিকন মোড় এলাকার আজিজুল ইসলাম। সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি ডিপো ও দোকান ঘুরেও এলপিজি না পেয়ে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এলপিজি মালিক সমিতি ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। বৈঠকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সংকট কাটেনি।
সূত্র জানায়, রংপুরে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ সিলিন্ডার বিক্রি হয়। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম, ফলে রান্না ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতারা দাবি করছেন, এলপিজি কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করছে না। অনেক ক্ষেত্রে কোনো মেমো ছাড়াই মাত্র ৪ থেকে ৬টি সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
তারা আরও বলেন, নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি না থাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার ভোক্তার কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহামুদুল হক বলেন, ‘মজুতদারি, অতিরিক্ত দাম আদায় ও মেমোবিহীন বিক্রির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর অভিযান না চালালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।’
তার মতে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ডিসেম্বর মাসে ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অটোগ্যাসের দামও লিটারপ্রতি ৫৯ দশমিক ৮০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসব দামের কোনো প্রতিফলন নেই—উল্টো চলছে লাগামহীন মূল্য নৈরাজ্য।