চট্টগ্রাম ব্যুরো: সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ বাদ দেওয়ার কথা জুলাই সনদে উল্লেখ নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। একইভাবে জুলাই জাতীয় সনদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বাতিল করার কথাও বলেনি বলে তিনি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে’ তিনি এসব কথা জানান। চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলী রিয়াজ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে সবরকম অপপ্রচার হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন জুলাই সনদ হলে বিসমিল্লাহ থাকবে না, কেউ কেউ বলেন ১৯৭১ সালকে মুছে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো সঠিক নয়। জুলাই জাতীয় সনদ কোনো অবস্থায়ই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বাতিল করা কথা বলেনি। রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়নি এমন কোনো বিষয়ই সেখানে উল্লেখ নেই। একইভাবে বিসমিল্লাহ বাদ দেওয়ার বিষয়েও জুলাই জাতীয় সনদে কিছু উল্লেখ নেই। গণভোটেও সেই প্রশ্ন করা হয়নি।’
‘যারা এসব বলছেন, তারা হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল বলছেন, ভুল বোঝার কারণে ভুল বলছেন অথবা অন্য কোনো কারণে ভুল বলছেন। আমি আশা করি যে তারা তাদের ভুলগুলো বুঝতে পারবেন, তারা বুঝতে পারবেন যে তাদের অবস্থান সঠিক নয়। আশা করি, তারা তাদের অবস্থান সঠিক করবেন যদি-না তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকে। এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণার নানারকম কারণ থাকতে পারে। ভুল প্রচারণার অনেকগুলো কারণ আছে। কিন্তু সেগুলো মোকাবিলা করেই আমাদের মানুষজনকে বোঝাতে হবে।’
ইমাম-খতিবদের উদ্দেশ্যে আলী রিয়াজ বলেন, ‘আপনারা যদি ইমাম হিসেবে, খতিব হিসেবে মসজিদের খুতবার সময় কিংবা অন্য সময় গণভোটে হ্যাঁ- এর পক্ষে বলেন, গণভোটের কথা প্রচার করেন, কেউ তার বিরোধিতা করতে পারে কি-না, এই প্রশ্ন আপনারা করেছেন। হ্যাঁ, বিরোধিতা যদি সুস্থিরভাবে করে, যদি কেউ আপনার সঙ্গে যুক্তিতর্ক দিয়ে আলোচনায় যেতে চায় তাহলে অবশ্যই বিরোধিতা করতে পারে। আমরা অনেক বিষয়েই একমত হব না। কিন্তু আপনাকে তার থেকে বিরত করতে পারে না। কারণ, আইনগতভাবে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিতদের হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে প্রচারণার ব্যাপারে কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা নেই।’
‘আমাদের আইনের বিশেষজ্ঞরা আইন খতিয়ে দেখে, সংবিধান দেখে বলছেন- যে আদেশের অধীনে এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হচ্ছে, যে অধ্যাদেশের আওতায় গণভোট হচ্ছে, এর কোথাও এই ব্যবস্থা করা হয় নাই যে আপনি বলতে পারবেন না। কেউ বলতে চাইলে, যুক্তিতর্ক দিয়ে তিনি যদি বলতে চান আমরা শুনব, আপনারাও শুনুন। অবশ্যই শুনতে হবে। কারণ কি? সকলের মত যাতে প্রকাশিত হতে পারে তেমন ব্যবস্থা করার জন্যই তো জুলাই। তার আগে আপনাদের কথা শোনার ব্যাপারে বিভিন্নরকম বাধাবিঘ্ন তৈরি করা হয় নাই? হইছে তো। আমরা চাই, সকলের মত নিশ্চিত করতে হবে।’
গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আলী রিয়াজ বলেন, ’সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না নিজের দলের বিরুদ্ধে, সেটা এমনও হতে পারে এমন সিদ্ধান্ত যেটা তার নিজের এলাকার জন্য ক্ষতিকারক, তারপরও কিচ্ছু বলতে পারবে না। কারণ নিজের দলের বিরুদ্ধে যদি ভোট দেন তাহলে তার সদস্য পদই চলে যেত। সেটা নিয়ে সব দল একমত হলো যে এটা বদলাতে হবে। বদলিয়ে কি করলাম আমরা? যে দুটো বিষয়ে দলের বিরুদ্ধে বলা যাবে না- একটা হচ্ছে বাজেট। সেটা কি কারণে? কারণ বাজেট নিয়ে তালবাহানা করা যাবে না, কারণ বাজেট পাস না হলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, আপনার পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে, সরকারি কর্মচারীরা বেতন পাবেন না।’
‘সেটার জন্য আমরা বললাম যে- ক্ষমতাসীন দল বা যে কোনো দল তবে প্রধানত ক্ষমতাসীন দল যদি বাজেট প্রস্তাব করেন, তার বিরুদ্ধে তার নিজের দলের লোক ভোট দিতে পারবেন না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে- সংবিধান সংশোধনী। ক্ষমতাসীন দল যদি নিজেদের মধ্যে আলাপ করে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর যারা প্রতিনিধি সংসদ সদস্য তারা এর বিরোধিতা করতে পারবেন না। আরেকটা বিষয় বলা হয়েছে যে, দেশে যদি যুদ্ধ লাগে, তাহলে যুদ্ধাবস্থায় নিজ দলের লোক যাতে বিরোধিতা করতে না পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করা হলে সংসদ সদস্যরা অন্তত বিবেকের তাড়নায় হলেও কিছু সত্য কথা বলতে পারবেন। জুলাই জাতীয় সনদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে যে, ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে দুটো, বড়জোট চারটা বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে তারা কথা বলতে পারবেন এবং তারা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারবেন। এই যে ব্যবস্থাগুলো সেই ব্যবস্থাগুলোই কিন্তু হচ্ছে।’
সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে আলী রিয়াজ বলেন, ‘উচ্চকক্ষ গঠিত হবে কিভাবে? বাংলাদেশে আপনারা যখন ভোট দেন, আমরা যখন ভোট দেই আমরা আমাদের পছন্দমত ভোট দেই। তাতে কিছু কিছু দল ৪ শতাংশ, ৫ শতাংশ, ৬ শতাংশ ভোটও তো পায়, পায় না? তাদের তো কোনো প্রতিনিধি থাকে না সংসদে। তাদের কোনো প্রতিনিধি থাকে না। কারণ তারা সিট জেতে না। এই যে ৫-৬ শতাংশ ভোট, এই ৫-৬ শতাংশ মানুষও কোনো একটা কথা বলতে চায়, আমরা কি সেটা অগ্রাহ্য করতে পারি? তাদেরও তো কোথাও না কোথাও প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার। সেজন্য আমরা বলছি যে উচ্চকক্ষ থাকা দরকার।’
‘সংখ্যানুপাতিক, এটাকে ইংরেজিতে পিআর বলে। অত কঠিন শব্দ আমরা খুব একটা বুঝিও কম, মানতেও চাই না। আমার কথা হচ্ছে- প্রত্যেক ভোটের হিসেব হবে, প্রত্যেক ভোটের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, সেটাই হচ্ছে ব্যবস্থা। সেজন্য উচ্চকক্ষে পাঁচ শতাংশ ভোটের জন্য পাঁচটা সিট থাকবে। তাহলে উচ্চকক্ষ সংবিধান সংশোধনকে একটু কঠিন করবে। আরেকটা বিষয় সেটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি কিভাবে নির্বাচিত হন? সংসদে। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল চাইলেই একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাস করিয়ে নিতে পারে। যে দলেই ক্ষমতাসীন থাকবে, তার লোককেই রাষ্ট্রপতি বানাতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘সেই জায়গায় আমরা বলেছি, ওইটা উচ্চকক্ষেও হতে হবে। এমনকি সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারবেন। অনেকে বলেন- রাষ্ট্রপতির কোনো মহা ক্ষমতা নেই, তাহলে রাষ্ট্রপতি নিয়ে এত চিন্তিত কেন? চিন্তিত এই কারণে যে, উনি তো রাষ্ট্রের প্রতীক। যে রাষ্ট্র নিয়ে আমরা গর্ব করবো, তার প্রতীককে নিয়েও কি আমরা গর্ব করব না? করতে হলে যখনই এ রকম ব্যবস্থা থাকবে, তখনই ক্ষমতাসীন দল একটু বিবেচনা করে একজন ভালো মানুষ সম্মানিত মানুষ তাকে মনোনয়ন দেবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। ফলে যারে চাইলাম, পায়ে ধরে সালাম দিয়েছিল কী দেয় নাই, সেই বিবেচনা থেকে কোনো অবস্থাতেই আর কোনো রাষ্ট্রপতি যাতে এই দেশে তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা আপনারা করতে পারেন।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।