ঢাকা: রাজধানীতে গত কয়েক মাসে বেশকিছু আবাসিক ভবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ঘন ঘন আগুন লাগার কারণ হিসেবে দেখা গেছে- ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। তবে, এবার ঘটেছে ব্যতিক্রম ঘটনা- রাজধানীর উত্তরা একটি আবাসিক ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয় ভবনের দ্বিতীয় তলায়, কিন্তু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার বাসিন্দাদের, যা নিয়ে উদ্বেগ ও নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর আবাসিক ভবনটিতে এ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ১৩ জন দগ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) সকাল ৮টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স–এর চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ১৬ জনকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালসহ উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
আগুন লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে ভবনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় তলার রান্নাঘর থেকেই আগুনের উৎপত্তি হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ওই ফ্ল্যাটে প্রচুর আসবাবপত্র থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত নয়, আগুন রান্না ঘর থেকে লেগেছে নাকি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে। বিস্তারিত তদন্তে জানা যাবে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোন-৩ -এর উপসহকারী পরিচালক মো. আবদুল মান্নান বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে। আগুন দ্বিতীয় তলায় লেগে তা ৩ তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছে। তবে তদন্ত ছাড়া এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি রফিক আহমেদও প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, দোতলায় রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। গ্যাস সংযোগ অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করছি।
সরেজমিনে ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাদের মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই দুই পরিবারের সদস্য। এক পরিবার পঞ্চম তলায় ও আরেক পরিবার ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন।
নিহতদের মধ্যে কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২) পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন।
রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে। তিনি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। তাদের আরেক ছেলে ফাইয়াজ উত্তরায় নানির বাসায় থাকায় ভয়ংকর বিপদ থেকে বেঁচে গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাব্বির মরদেহ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানের মরদেহ ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে পাওয়া যায়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই তিনজনের শরীরে দগ্ধের কোনো চিহ্ন ছিল না; ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে নিহত আরেক পরিবারের সদস্যরা হলেন- মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। তারা থাকতেন ভবনের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে।
তাদের মধ্যে হারিছ ও রাহাবের মরদেহ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং রোদেলার মরদেহ লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে পাওয়া যায়। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ফল ব্যবসায়ী হারিছ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিডনি জটিলতার কারণে তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো।
প্রশ্ন উঠেছে, আগুন দুইতলায় লাগলেও পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে থাকা মানুষগুলো কেমনে মারা গেল? ভবনটির দুই দিকে ফ্ল্যাট, মাঝখানে সিঁড়ি। সামনে থেকে ভবনের বাম দিকে আগুন লাগলেও অন্যপাশে কোনো আগুন ছিল না এবং সিঁড়িতেও কোনো আগুন ছিল না। এরপরেও ওপরের দুইটি তলার মানুষগুলো কেমনে মারা গেল? এ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তদন্ত টিম।
পাশের ভবনের বাসিন্দা আলফাজ উদ্দিন। তিনি ফজর নামাজের পর ঘুমিয়েছিলেন। আগুন লাগার সংবাদ শুনে বাইরে বের হন। তিনি দেখেন, দুই তলার সামনের অংশ দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা বের হচ্ছে। আর কোথাও আগুন ছিল না। তবে, পুরো ভবনে কালো ধোয়ার কুণ্ডলী ছিল। ভেতর থেকে শুধু কান্না আর বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল না। ভবনের বের হওয়ার গেট বন্ধ ছিল। ফলে অনেক নিচ তলা পর্যন্ত নামতে পারলেও প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।
আগুন লাগা ভবনের বাসিন্দা রায়হান উদ্দিন বলেন, আগুনের গন্ধ পেয়ে পরিবারকে টেনে হিঁচড়ে নিচে নামিয়েছেন। মূল গেট বন্ধ থাকলেও আমরা নিচেই ছিলাম। সেখানে ধোয়া কম ছিল। কিন্তু, ওপরের তলাগুলো থেকে যারা নিচে নামতে চেয়েছিলেন তারা হয়তো নামতে গিয়ে সিঁড়িতে ধোয়ার কুণ্ডলিতে আটকা পড়ে ছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের এক উদ্ধারকর্মীও বলেছেন, দুই-তিন জনকে সিঁড়ির মাঝপথ থেকে নিস্তেজ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
মেজবাহ উদ্দিন নামে আরেকজন বলেন, ভবনের ছাদের গেট তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। ছাদের গেট তালাবদ্ধ না থাকলে হয়ত অনেকে ছাদে চলে যেতে পারতেন। পুরো ভবনে যখন ধোয়ার কুণ্ডলী তখন আর বাঁচার কথা নয়। বাড়িওয়ালা ছাদের চাবি কাউকে দেয় না। অথচ ছাদ খোলা থাকলে মৃত্যু নাও হতে পারতো।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শাহরিয়ার আলী বলেন, আগুন লাগার আগে প্রচণ্ড শব্দ হয়েছিল। এরপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোনো কিছু বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে। ভবনের নিচের গেট ও ওপরে ছাদের দরজায় তালাবদ্ধ ছিল। খোঁজ করা হচ্ছে। আগুন লাগা ফ্ল্যাটে কারা ছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছাদে উঠে তালা কেটে অনেককে ছাদ থেকে উদ্ধার করে। সাধারণ আগুন ছিল না কি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাড়ির মালিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যারা মারা গেলেন তারা কীভাবে মারা গেলেন সব মিলিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
আগুন লাগা ভবনের সামনে উপস্থিত বাসিন্দারা দাবি তুলেছেন, আগুন যেকোনো সময় যেকোনো ভবনে লাগতেই পারে। তবে ছাদের গেট যেন তালাবদ্ধ না থাকে সেই ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেছেন। একইসঙ্গে নিরাপত্তার কারণে তারা লাগানো হলেও তার চাবি যেন ওপরের তলার বাসিন্দাদের কাছে দেওয়া হয় সেই আহ্বান জানিয়েছেন অনেক বাসিন্দা।