Thursday 22 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
উত্তেজনা এখন স্টেডিয়ামের বাইরে, শীতল হবে কবে?

অপূর্ব কুমার, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৩৬

বাংলাদেশ ও ভারতের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনীতিক সম্পর্ক বর্তমানে একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশন থেকে ভারতীয়দের জন্য ভিসা প্রদান আপাতত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতের মিশন নন ফ্যামিলি পোস্টিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে, স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন এতটা খারাপ পর্যায়ে যায়নি। এই নেতিবাচক সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতি, খেলা, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রার সবখানেই। বিশেষ করে এখন আলোচনায় আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ।

অতীতে ক্রিকেট খেলায় ভারতের আধিপত্যবাদের অভিযোগ সমালোচিত হলেও আগামী মাসে ভারত ও শ্রীলংকায় অনুষ্ঠেয় আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছছে। এতদিন ক্রিকেট খেলার উত্তেজনা ২২ গজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে স্টেডিয়ামের বাইরেও। রীতিমতো দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনড় বাংলাদেশ। বেশি কিছুদিন আগেই সেটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) জানানো হয়েছে। আবার আইসিসিও শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে যাওয়ার কথা বলেছে। এরকম আলোচনার মধ্যেই বুধবার (২১ জানুয়ারি) আইসিসি জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে কি না কিনা সেটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দিতে হবে। নইলে র‌্যাংকিংয়ের পরবর্তী তালিকায় থাকা স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপে খেলবে। তবে ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই বাংলাদেশ ক্রিকেট কাউন্সিল জানিয়েছে, তারা কোনো অবস্থাতেই ভারতে খেলতে যেতে আগ্রহী নয়।

ক্রিকেট নিয়ে টানাপোড়েনের শুরু ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া নিয়ে। দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় চরমপন্থী রাজনীতিক দলগুলো হুমকি দেয় যে, মোস্তাফিজ আইপিএল-এ খেললে তার ওপর হামলা করা হবে। চরমপন্থী দলের হুমকি বিবেচনায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের পরামর্শে কলকাতা নাইট রাইডার্স কর্তৃপক্ষ মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেয়।

এর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অন্তবর্তী সরকারের সঙ্গে আলাপ করে ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আইসিসিকে জানিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় বাংলাদেশ ভারতে না গিয়ে শ্রীলংকায় ম্যাচগুলো খেলতে আগ্রহী। এটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ঝুলে থাকার পর অবশেষে আইসিসি জানায় যে, বাংলাদেশকে খেলতে হলে শর্তসাপেক্ষে ভারতে গিয়েই খেলতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ীও, তারা ভারতে খেলতে না যাওয়ার প্রশ্নে এখনো অনড়।

২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যেমন ভারতবিরোধী বক্তব্য দিতে থাকে, ঠিক বিপরীত দিকে থেকে ভারতও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দমন পীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এইসব অভিযোগকে পাত্তা না দিয়ে ভারতের অজুহাত হিসেবে বিবেচনায় নেয়। এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো কোনো সময় প্রতিবাদও জানানো হয়। এমনকি কিছু কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদ জানায় ভারতও।

শুরুতে দুই দেশের পক্ষে-বিপক্ষের বক্তব্য কিছুটা হালকা হলেও আস্তে আস্তে বিরোধিতার সুর দু’পক্ষ থেকেই বাড়তে থাকে। এমনকি বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারত। এ ছাড়া, চিকিৎসাসহ অন্যান্য ভিসা প্রদানের পরিমাণ জনবল সংকটের কথা বলে কমিয়ে দেয় দেশটির বাংলাদেশের হাইকমিশন। এরই মাঝে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের ভারতে আশ্রয়ের অভিযোগ আনে ইনকিলাব মঞ্চসহ আরও বেশ কিছু সংগঠন। এরই অংশ হিসেবে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন মুখে রাজনৈতিক দলগুলোর গণমিছিল কর্মসূচি চলতে থাকে। এছাড়া, চট্টগ্রামে অবস্থিত ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনে হামলার অভিযোগ আনে ভারত। একইভাবে ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশি হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও পরিবারকে সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনে বাংলাদেশ। নয়াদিল্লির পাশাপাশি জলপাইগুড়ি, গুয়াহাটি ও কলকাতা মিশনের সামনেও ভারতের উগ্রপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও হামলার চেষ্টা করে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য জরুরি কিছু ভিসা বাদে পর্যটনসহ অন্যান্য ভিসা আপাতত বন্ধ ঘোষণা করে। এভাবে ক্রমশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দুই দেশের সম্পর্ক।

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের শীতলতা থাকলেও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘অর্থনীতিতে খুব বেশি প্রভাব পড়ছে না। বাংলাদেশ অর্থনীতিকে রাজনীতির বাইরে রাখছেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনীতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের জন্য সরকার ভারত থেকে ভোগ্যপণ্য, চাল ও পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে।’

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশ গত ২০২৫ সালেও ভারত থেকে সর্বোচ্চ আমদানি করেছে। এমননি এটি ২০২৪ সালের চেয়েও বেশি। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সরকার ভারত থেকে দুই লাখ মেট্রিকটন চাল আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বন্ডের সুবিধা প্রত্যাহার করলেও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সুতা আমদানি করে থাকে ভারত থেকে। এমনকি কাঁচা সবজির পাশাপাশি বেশকিছু মাছও ভারত থেকে আমদানি করা হয়। পাশাপাশি ভারতও বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ আমদানি এবং পাট ও পাটজাত দ্রব্য আমদানি করে থাকে। সংক্ষিপ্ত এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো অক্ষুণ্ন। যদিও দুই দেশেরই রাজনীতিকদের প্রকাশ্য বক্তৃতায় পারস্পরিক আক্রমণের কমতি নেই। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি।

বিসিবির অবস্থান সঠিক বলে মনে করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ভারত নিরাপত্তা দিতে পারেনি উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘একজন ক্রিকেটারকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারে ভারত, তবে একটি ক্রিকেট দল বা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব? এ অবস্থায় নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলতে চাইবে বাংলাদেশ। সবার আগে নিরাপত্তা। সেই কারণে ভারতে খেলার বিষয়ে বিসিবির সিদ্ধান্ত সঠিক।’

এস জয়শঙ্করের সফর ঘিরে আশাবাদ

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে গত ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এস জয়শঙ্কর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর লেখা চিঠি ও শোকবার্তা বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। সাক্ষাৎ শেষে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জয়শঙ্কর লেখেন, ‘আমাদের অংশীদারিত্বের উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধ পথ দেখাবে বলে আশা করছি।’

ফেসবুক পোস্টে জয়শঙ্কর লিখেন, ‘ঢাকায় পৌঁছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি তার কাছে হস্তান্তর করেছি।’ তিনি আরও লিখেন, ‘ভারত সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।’ আর বৈঠক শেষে বিএনপি তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারত বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা পাঠিয়েছে। তাঁকে ‘গণতন্ত্রের জননী’ এবং ‘সাহস ও সংগ্রামের প্রতীক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে-যিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন ছিলেন।

মূলত শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এলেও শেষ পর্যন্ত এই সফর শুধু শোক ও শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্তত বিএনপি ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অভিব্যক্তির প্রকাশের পর তেমনটিই মনে হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলেও দুই দেশের সম্পর্কের আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলাপকালে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, ‘যারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসবে এবং বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যে সরকারকেই বাছাই করবে, আমরা তার সঙ্গে কাজ করব।’

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করে বাংলাদেশ সরকার যে বক্তব্য দিয়েছে, আমরা তাতে উৎসাহিত এবং আমরা প্রতীক্ষায় আছি, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবং আমরা আশা করি কোনো বিলম্ব না ছাড়াই তা হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকারই আসুক না কেন, আমরা তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রতীক্ষা আছি। বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য যে সরকারকেই বাছাই করবে, আমরা তার সঙ্গে কাজ করব।’

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন থাকলেও সময়ে সঙ্গে সঙ্গে তা কমে আসবে। বিশেষ করে আগামীতে নির্বাচিত সরকার এলে নিজেদের স্বার্থেই দুই দেশ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসবে।’ কারণ, দীর্ঘমেয়াদে নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে টানাপোড়েন কারও জন্যই সুখকর নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর