Tuesday 27 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নির্বাচন-২০২৬
নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা ও প্রযুক্তি নিয়ে মাঠে নামবে বিজিবি

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৩০

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ফাইল ছবি

ঢাকা: ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই নির্বাচনকে ঘিরে জনআস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি দ্বৈত দায়িত্ব নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে। একদিকে ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষা, অন্যদিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সক্রিয় ভূমিকা পালন।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, এবার নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে বাহিনীটি একাধিক নতুনত্ব ও সময়োপযোগী পরিবর্তন যুক্ত করেছে। নির্বাচনি নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন পরিকল্পনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিস্তৃত ও লক্ষ্যভিত্তিক। দেশজুড়ে ৪৮৯টি উপজেলায় নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে বিজিবি। সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় একক স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে তারা।

বিজ্ঞাপন

এই দায়িত্ব পালনে বিজিবি তার সবচেয়ে বড় শক্তিকে সামনে আনছে— ভূ-খণ্ডভিত্তিক দক্ষতা। পাহাড়, বন, চর ও নদীবেষ্টিত এলাকায় দীর্ঘদিনের অভিযানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নৌযান, মোটরসাইকেল ও অল টেরেইন ভেহিকেল ব্যবহার করে প্রত্যন্ত ভোটকেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আগাম উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। লক্ষ্য একটাই— ভোটের পরিবেশ নষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা আগেই নস্যাৎ করা।

নির্বাচনি প্রস্তুতির অন্যতম নতুন দিক হলো প্রশিক্ষণ কাঠামোর রূপান্তর। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ ধাপে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স, মূল প্রশিক্ষণ, রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি অনুকরণে সিচুয়েশনাল এক্সারসাইজের মাধ্যমে প্রতিটি সদস্যকে নির্বাচনি দায়িত্বের জন্য মানসিক ও পেশাগতভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ, উত্তেজনা প্রশমন, বলপ্রয়োগের আইনগত সীমা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যৌথ অভিযান এবং সদস্যদের আত্মসুরক্ষা—সবকিছুই প্রশিক্ষণের মূল অংশ।

প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতেও নতুনত্ব এনেছে বিজিবি। দূরবর্তী বিওপিতে দায়িত্বরত সদস্যদের জন্য হাইব্রিড প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অনলাইন ক্লাস, অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এবং মোবাইল ট্রেনিং টিম সরাসরি বিওপিতে গিয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে দায়িত্ব পালনে ঘাটতি না রেখেই সারাদেশে অভিন্ন মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।

নির্বাচনি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহারে। ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে বিজিবির জন্য এমন একটি নির্বাচন, যেখানে প্রথমবারের জন্য নন লেথাল অস্ত্র বিজিবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাবার কার্টিজসহ ১২ গেজ শটগান এবং সাউন্ড ও স্মোক গ্রেনেড যুক্ত করা হয়েছে রায়ট কন্ট্রোল সরঞ্জামের তালিকায়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চরম বিপর্যয়কালীন সময়ও বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি, বডিওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম রেকর্ড এবং আধুনিক ওয়াকিটকির মাধ্যমে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এসব প্রযুক্তি শুধু নজরদারি নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্ত নিরাপত্তাকে নির্বাচনি নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বিজিবি। অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক পাচার ঠেকাতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গত এক মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৯টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ৯৭০ রাউন্ড গুলি এবং ২ দশমিক ৩ কেজি গানপাউডারসহ বিস্ফোরক সামগ্রী। পুরো ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরিমাণ আরও বেশি, যা নির্বাচনের আগে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ইঙ্গিত দেয়।

নিরাপত্তার পাশাপাশি জনআস্থা তৈরিতেও নতুন কৌশল নিচ্ছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় লিফলেট বিতরণ, বিলবোর্ড স্থাপন ও জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে এই সক্রিয় যোগাযোগকে বাহিনীটি নির্বাচনি নিরাপত্তার একটি কার্যকর উপাদান হিসেবে দেখছে।

এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য পোস্টাল ব্যালট চালুর সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে বিজিবি। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ বাহিনীর মনোবল ও গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেবল রুটিন নিরাপত্তা পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নন লেথাল অস্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, হাইব্রিড প্রশিক্ষণ ও জনসম্পৃক্ততার মতো নতুনত্বের মাধ্যমে বিজিবি নিজেকে একটি আধুনিক, পেশাদার ও গণতন্ত্রবান্ধব বাহিনী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এই প্রস্তুতির বাস্তব প্রয়োগই নির্ধারণ করবে নির্বাচনের মাঠ কতটা নিরাপদ ও আস্থার হবে।

এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী কক্সবাজারে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের জন্য বিজিবি সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, বিশেষ ব্রিফিং, আইনানুগ দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা, আচরণবিধি এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসটিএক্স (STX) অনুশীলন সম্পন্ন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র, ব্যালট, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শান্ত, পেশাদার ও আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি’র হেলিকপ্টারসহ কুইক রেসপন্স ফোর্স (QRF), র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম (RAT), বিশেষায়িত K-9 ডগ স্কোয়াড, ড্রোন এবং বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

বিজিবি মহাপরিচালক দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত হবে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সংবিধান ও আইনের আলোকে অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন অব্যাহত রাখবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর