ঢাকা: লায়লা কাওসার, দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে বাস করছেন লন্ডনে। এর আগের নির্বাচনগুলোতে দেশে না থাকায় ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। কারণ, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে পোস্টাল ভোটিং। ফলে এবার বিদেশে থেকেই লায়লা কাওসারের মতো প্রবাসীরা ভোট দিচ্ছেন।
এরই মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি পোস্টাল ব্যালট বিদেশে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত ২১ জানুয়ারি থেকে প্রবাসীরা ভোট দিয়ে পোস্টাল ব্যালট দেশে পাঠাচ্ছেন। লায়লা কাওসারও তাদের মধ্যে একজন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট পোস্ট করার আগে সেই মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।’ পদক্ষেপটা ভালো, তবে আরও বেশি সহজ করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তিনি।
একদিকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়া নিয়ে যখন প্রবাসীরা উচ্ছ্বসিত, তখন এই ব্যালট নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। কারণ, নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও আদালতের মাধ্যমে বেশ কয়েকজন প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ইসি কর্মকর্তাদের কপালে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৭২ জন। সেই তালিকা অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালট ছাপিয়ে ৭ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি প্রবাসীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে আদালতের নির্দেশে সবশেষ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) পর্যন্ত প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৭ জনে।
জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে নতুন করে আরও ৪০-৪৫ জন প্রার্থী যুক্ত হওয়ায় প্রবাসীদের পাঠানো পোস্টাল ব্যালট নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা। কারণ, পোস্টাল ব্যালটে নতুন করে যুক্ত হওয়া কোনো প্রার্থীর প্রতীক নেই। এখন যেসব আসনে নতুন প্রার্থী যুক্ত হয়েছে, সেখানের পোস্টাল ব্যালট ফের পাঠানোর সুযোগও নেই। তাই ওইসব আসনে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন।
জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ৩০০টি আসনে মোট ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়ন জমা হয়। যেখানে প্রথমবার বৈধ প্রার্থী ছিল ১ হাজার ৮৫৭ জন। মনোনয়ন বাতিল করা হয় ৭২৫ জনের । এর পর আপিল নিষ্পত্তিতে আবেদন জমা পড়ে ৬৪৬টি। এর মধ্যে আপিল ও আদালতের মাধ্যমে ৪৭১ জন প্রার্থিতা ফিরে পায়। আর বৈধ মনোনয়ন আপিলের মধ্যে বাতিল হয় আরও পাঁচটি। এর পর প্রার্থিতা করেন ৩০৫ জন। সব শেষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ২৭ জন।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ২৮ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত বিদেশে পাঠানো ব্যালটের সংখ্যা ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৩২৮ জন ভোটার ব্যালট গ্রহণ করেছেন। আর ভোটদান সম্পন্ন করেছেন ৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৯ জন। আর পোস্ট অফিসে ব্যালট জমা দেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯টি। এর মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে ২৯ হাজার ৭২৮টি।
এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আমরা কিছুটা ঝামেলায় পড়েছি। যেসব আসনে প্রার্থী বেড়েছে, সেখানকার প্রবাসীদের ব্যালট নতুন করে পাঠানোর প্রয়োজন আছে কি না বা সময় বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তবে দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’
এদিকে ইসির কর্মকর্তারা জানান, ৩০০ আসনের মধ্যে যেসব আসনে কোনো আইনি জটিলতা নেই, সেগুলোর ব্যালট পেপার ছাপানোর কাজ পুরোদমে চলছে। তবে অন্তত অর্ধশত আসনে প্রার্থীর সংখ্যা পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় সেগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে কমিশন।
উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসেই নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এই চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শেষ সময়ে আদালতের আদেশে প্রার্থিতা ফিরে এলে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইনি জটিলতা এড়িয়ে ইসি কীভাবে এই ভোটারদের অধিকার নিশ্চিত করে।’
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং একটি সাংবিধানিক সংকটও। যদি একজন প্রার্থীর নাম ব্যালটে না থাকে, তবে সেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে। এখন দেখার বিষয়, আইনি ও কারিগরি এই জটিলতা কাটিয়ে ইসি কীভাবে লাখো প্রবাসী ভোটারের অধিকার এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।