ঢাকা: বিশ্বে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। গত বছরের চেয়ে এবার বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। এই এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে।
তবে, ২০২৪ সালের ১৪তম অবস্থান থেকে এক ধাপ এগিয়ে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ১৩তম স্থানে উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫’ প্রকাশ করে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রতিবেদনের ফলাফল তুলে ধরেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
সিপিআই (সিপিআই) অনুসারে, সরকারি খাতে দুর্নীতির মাত্রা বা ধারণা ০ থেকে ১০০ স্কেলে পরিমাপ করা হয়। এখানে ০ মানে দুর্নীতির ধারণা সর্বোচ্চ এবং ১০০ মানে সর্বনিম্ন (বা সব থেকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত)। ২০২৫ সালে ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২৪, যা গত বছর ছিল ২৩। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় স্কোরের দিক থেকে ১ পয়েন্ট উন্নতি হয়েছে। নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম- যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে চতুর্থ সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থান।
বিশ্বজুড়ে ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের সরকারি খাতের দুর্নীতির ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই সিপিআই র্যাঙ্কিং বা ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা দুর্নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি। আমাদের স্কোর অত্যন্ত হতাশাজনক।
ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সিপিআই ২০২৫ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের দুর্নীতির একটি চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কোন দেশগুলোর উন্নতি হচ্ছে, কাদের অবনতি ঘটছে এবং কারা স্থবির অবস্থায় আছে।
তিনি জানান, বৈশ্বিকভাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪৮টি দেশের স্কোর বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৮টি দেশের স্কোর কমেছে এবং ৬৪টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। সূচকের ০ থেকে ১০০ স্কেলে কোনো দেশই শতভাগ স্কোর অর্জন করেনি। বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ দেশ (১২২টি) এ বছর ৫০ এর কম স্কোর পেয়েছে। এবার বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২- যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১২ সাল থেকে এই সূচকে ৩১টি দেশের উন্নতি হলেও, ৫০টি দেশের অবনতি হয়েছে। সূচকে ৮৯ স্কোর পেয়ে ২০২৫ সালে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক, ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। আর ৯ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন- সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভূক্ত ছিল না। এ বছর স্কোর বিবেচনায় উচ্চক্রম অনুসারে এক ধাপ ওপরে উঠে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম এবং নিম্নক্রম অনুসারে গত বছরের তুলনায় এক ধাপ অবনতি হয়ে ১৩তম। একই স্কোর নিয়ে তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় ১৬ পয়েন্ট ও উর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৬৯তম অবস্থান নিয়ে সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। এ অঞ্চলে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
টিআইবির বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলে, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগজনক বলেই প্রতীয়মান হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ এই সূচক অনুযায়ী এমন দেশগুলোর মধ্যে আছে, যারা দুর্নীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে ‘বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত বা বাংলাদেশের অধিবাসীরা সবাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত’-এ ধরনের ব্যাখ্যা ঠিক নয়। যদিও দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য দূরীকরণ- সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে কঠিনতম অন্তরায়। কিন্তু দেশের আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তারা দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগীমাত্র এবং দুর্নীতির হাতে জিম্মিদশার কারণে তাদের অনেকক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনে বাধ্য হতে হয়। তাই ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে দেশ বা জনগণকে কোনোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না।