ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি ইতিবাচক মাইলফলক হিসাবে ভোটের মাঠে পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ইলেকশন অবজারভার সোসাইটির (ইওএস) পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ভোটের পর নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়নে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রেস বিজ্ঞপিত্ততে বলা হয়, দেশব্যাপী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে, কোনো ধরনের অর্থায়ন ছাড়াই ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (EOS) মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত প্রতিটি পর্যবেক্ষক সংস্থা তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন যথানিয়মে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এ জমা দেবে। আজকের এই উপস্থাপনা একটি সংক্ষিপ্ত সামগ্রিক মূল্যায়ন।
নির্বাচন পূর্ব পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি
নির্বাচন আয়োজনের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে কিছু অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করেছিল।
তবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকে ঘিরে একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। যদিও কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। দাবির মুখে পরে কয়েকটি সিদ্ধান্ত সংশোধন বা প্রত্যাহার করা হয়— যেমন প্রতীকের অবস্থান পরিবর্তন, শাপলা প্রতীক অন্তর্ভুক্তির সময়কাল, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ।
ঋণখেলাপি ইস্যুসহ কিছু বিষয়ে কমিশন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, যা ইসির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে।
পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মীদের পরিচয়পত্র অনলাইন-অফলাইন সিদ্ধান্থহীনতায় উভয়ের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও ভোটার উপস্থিতি
কিছু কেন্দ্রে বুথ স্থাপনসংক্রান্ত অসামঞ্জস্য দেখা গেছে, যেমন নিচতলা ফাঁকা থাকার পরও উপরের তলায় বুথ স্থাপন করা হয়েছিল, যা বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারদের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। একই সঙ্গে সব কেন্দ্রে ভোটারের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি বলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিয়মান হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল, যা ভবিষ্যতে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।
সরকারের ‘হ্যাঁ ভোট’ প্রচারসংক্রান্ত ব্যয় ও পরবর্তী সময়ে কমিশনের শেষ মুহূর্তে নিষেধাজ্ঞা প্রদান জনমনে কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
নির্বাচনি আচরণ ও চ্যালেঞ্জ
কিছু শক্তিশালী প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা এবং পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রমণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষকদের নজরে আসে, যা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী।
নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত গুজব ছড়ানো এবং কিছু স্থানে ভোট প্রভাবিত করার অপচেষ্টা দেখা গেলেও সেগুলো সফল হয়নি এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনের পরিবেশ
সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক ও নিয়ন্ত্রিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারিত্ব, সক্রিয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী নির্বাচনী সময়জুড়ে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিছু ছোটখাটো অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল ও নিরাপদ। টানটান উত্তেজনার মধ্যেও কোনো প্রাণহানি ছাড়া নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোনো আসনে ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুতর অনিয়ম বা অসঙ্গতি চোখে পড়েনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আলোচনাতেও একই ধরনের মূল্যায়ন উঠে এসেছে। নারী ও তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততার ইতিবাচক প্রতিফলন।
সার্বিকভাবে নির্বাচনে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়েছে।
সুপারিশ
- ভবিষ্যৎ নির্বাচনের মানোন্নয়নের জন্য পর্যবেক্ষকদের সুপারিশ
- ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে আরও পরিকল্পিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ
- বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুবিধার্থে নিচতলায় বুথ স্থাপন
- বয়সভিত্তিক ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার বিষয় বিবেচনা
- আচরণবিধি বাস্তবায়নে আরও কঠোরতা
- যেকোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সংগে নির্বাচন কমিশনের সুষম সমন্বয়
- পর্যবেক্ষকদের যাতায়ত এবং আনুসঙ্গিক ব্যয় বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দরকার বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন
নির্বাচনের পরের দিন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ গণমাধ্যম এবং আমাদের স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলায় সহিংসতার ঘটনা, মুন্সিগঞ্জে প্রাণহানির ঘটনা, ফেনী এবং টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরসহ আরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর আমাদের কাছে পৌঁছেছে। আমরা আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে আমাদের আরও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করব।
উপসংহার
সামগ্রিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা, প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং ভোটারদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নির্বাচনকে সফলতার দিকে নিয়ে গেছে বলে পর্যবেক্ষকগণ অভিমত দিয়েছেন।
এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলে পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
উল্লেখ্য, এই বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইলেকশন অবজারভার সোসাইটির সভাপতি ইকবাল হোসাইন হীরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম আপ্পি, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আমিন, সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. নাসির উদ্দিন শাহ, নির্বাহী সদস্য মাহমুদা পারভীন, হিন্দু মহাজোটের সম্পাদক ড. মৃণ্ময় রায় এবং শান্তি সভা ন্যাশনাল খাতর ফাউন্ডেশনের সম্পাদক রুহুল আমিন।