ঢাকা: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক পর্যায়ে একটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সকলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘হাজারো শহিদের রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ কমপক্ষে ত্রিশ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। বর্তমানে একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয় চলছে।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা (এমপি) জাতির কাছে দায়বদ্ধ। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়-এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।’
নবগঠিত সরকারের সামনে বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই বিরাট চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘পথ কঠিন হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই বাধা অতিক্রম অসম্ভব নয়। সরকারি ও বিরোধী দলগুলো ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কাজ করলে খুব সহজেই দ্রুতার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই গৌরবময় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।’
রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সকল সংসদ সদস্যকে (এমপি) আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের নিবেদিতপ্রাণ জনসেবকসহ যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন তাদের সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অংশগ্রহণ, সেইসঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসাহী অংশগ্রহণ সমানভাবে প্রশংসনীয়। কারণ, তারা ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল ও স্থায়ী উদাহরণ স্থাপন করেছে।’
রাষ্ট্রপতি তার বক্তৃতার শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহিদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল অবিসংবাদিত নেতা এবং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় অসামান্য নেতৃত্বের জন্য তিনবার নির্বাচিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে, মামলার জট কমাতে, ন্যায়বিচার প্রদানে হয়রানি দূর করতে, দুর্নীতি প্রতিরোধে বিচারিক পরিষেবা আধুনিকীকরণ, বিচারিক নিয়োগের জন্য আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগীয় কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কাজ করছে, তাই সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘চরমপন্থা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতিতে কঠোর অবস্থানে গ্রহণ করে জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব হুমকি সম্পূর্ণরূপে দমন করা হবে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-‘সবার আগে বাংলাদেশ।’ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে।”
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং অভিবাসন কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা রক্ষায় কার্যকর কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা ও বাণিজ্য, ব্যাংকিং, প্রশাসন, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে যথাযথ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায়, বর্তমানে দেশে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা এবং স্নাতক (পাস) স্তর এবং সমমানের পর্যন্ত উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু রয়েছে। বর্তমান সরকার নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়েও অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ‘
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে একটি অস্থিতিশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল রয়েছে। রেমিট্যান্সসহ বেশ কয়েকটি সূচক ইতিবাচক প্রবণতা দেখাতে শুরু করেছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিও হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে, মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সরকার আশা করছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হবে।’
‘বিশ্বব্যাপী সংঘাত, অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং জিডিপির তুলনায় রাজস্বের অনুপাত কম থাকার কারণে অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মুদ্রাস্ফীতি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগামী মাসগুলিতে মুদ্রাস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে’।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘গতবছর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি ছিল ৪৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রফতানি ৮.৬০ শতাংশ বেড়ে ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৩২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং বিনিময় হার ছিল প্রতি মার্কিন ডলারে ১২২ দশমিক ৩০ টাকা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, “বর্তমান সরকার ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে, সুদের হার যৌক্তিক করতে এবং জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করবে। এই লক্ষ্যে একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
তিনি বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা, তদারকি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্ষমতায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করা হবে। ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণ সমস্যা পর্যালোচনা করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমা খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।’
মূলধন বাজার সংস্কারের জন্য একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে এবং গত পনেরো বছরে পুঁজিবাজারে অনিয়ম তদন্তের জন্য একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি।