Wednesday 18 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শিল্প-আবাসন-ইটভাটা গিলছে জমি
হুমকির মুখের রংপুরের কৃষি অর্থনীতি

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৪

শিল্প-আবাসন-ইটভাটা গিলছে আবাদি জমি। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা, অবৈধ ইটভাটা ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুর জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। তবে সাম্প্রতিক হিসাব অনুসারে সরকারি হিসাবের বাইরে আরও ১ হাজার ৫৮৬ হেক্টর গিলেছে বিভিন্ন কারণে। একই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৩ জন, আর খাদ্য চাহিদা বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৯৪ টন। কিন্তু, উদ্বৃত্ত বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৭০৫ টন। এতে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ভবিষ্যতে গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুসারে, পাঁচ বছর আগে জেলায় আবাদি জমি ছিল ২ লাখ ১ হাজার ৪৯১ হেক্টর, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৭ হেক্টরে। সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের হিসাবে এটি আরও কমে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫১৪ হেক্টরে নেমেছে। রংপুর সদর উপজেলায় নগরায়নের কারণে কৃষিজমি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আবাদি জমি ১২ হাজার ৯৪৬ দশমিক ৭ হেক্টর থেকে নেমে এসেছে মাত্র ৩ হাজার ৫৩ দশমিক ৫৩ হেক্টরে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ৫ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯টি কৃষক পরিবারের মধ্যে ৯৫ হাজার ১৪০টি ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ৪ হাজার ৪৯০ জন এবং ক্ষুদ্র কৃষক ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭৩ জন। বড় কৃষক মাত্র ৬ হাজার ৭৪ জন। পাঁচ বছর আগে উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৯ মেট্রিক টন (উদ্বৃত্ত ৪ লাখ ১ হাজার ৫৫০ টন), বর্তমানে উৎপাদন ১১ লাখ ৪ হাজার ৭৭৮ টন হলেও চাহিদা বেড়ে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৮ টনে দাঁড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত থাকছে মাত্র ৪ লাখ ৪ হাজার ৩৩৫ টন। এ ছাড়াও এক ফসলি জমি রয়েছে ৮ হাজার ৭৭৩ হেক্টর, তিন ফসলি ৯২ হাজার ৮৩২ হেক্টর।

রংপুর শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে পীরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা মাসুদার রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই এলাকায় ১৫-২০ বছর আগে দিগন্তজোড়া সবুজ কৃষিজমি ছিল। এখন সেখানে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।’ আরেক উপজেলা মিঠাপুকুরের কলেজশিক্ষক আব্দুস সালাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘মহাসড়কের দু’পাশে বিস্তীর্ণ জমি এখন আবাসন ও প্রতিষ্ঠানে ভরা। এভাবে চললে খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হবে।’

মুনাফার লোভে উর্বর জমি ধ্বংস করা হচ্ছে জানিয়ে বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা পলাশ কান্তি নাগ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এভাবে চললে রংপুরে খাদ্য নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়বে।’

এদিকে কৃষিবিভাগ বলছে, অবৈধ ইটভাটা আরও ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করেছে। উত্তরাঞ্চলের চার জেলায় ৫৯৫টি ইটভাটা ফসলি জমির উর্বর মাটি ব্যবহার করছে; পীরগাছায় একটি ভাটার ধোঁয়ায় ৪১ একর ধান-সবজি নষ্ট হয়েছে। জাতীয়ভাবে প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ফলে ধান উৎপাদন ০.৮৬-১.১৬ শতাংশ কমছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে দক্ষতা বাড়ায় উৎপাদন এখনো উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে তিন ফসলি জমি কোনোভাবেই অকৃষি খাতে যেন না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সুষম সার ও প্রযুক্তিনির্ভর চাষই ভবিষ্যতের পথ।’

তিনি বলেন, “সরকার এই সংকট মোকাবিলায় ‘ভূমি জোনিং ও কৃষিজমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে দেশের ৮০ শতাংশ কৃষিজমি শুধু কৃষির জন্য সংরক্ষিত রাখা, দ্বি-ত্রি ফসলি জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ এবং উপরিভাগের মাটি ইটভাটায় ব্যবহার বন্ধের বিধান রাখা হয়েছে।” এদিকে সরকারের মন্ত্রীরাও বলছেন, ‘কোনো অবস্থাতেই ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না।’

তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন মনে করেন, যথাযথ আইন প্রয়োগ, মাঠপর্যায়ে মনিটরিং এবং একই জমিতে বছরে দু’-তিনবার উন্নত প্রযুক্তির চাষ বাড়ালে রংপুর তার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যভাণ্ডারের মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে। অন্যথায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জমি ক্ষয়ের এই চক্র খাদ্য নিরাপত্তাকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর