Wednesday 18 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঈদযাত্রার ভাড়ায় নৈরাজ্য, আদায় হবে অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি টাকা: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৮ মার্চ ২০২৬ ২১:১৭

ঢাকা: সরকারি ঘোষণা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাস-মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, এবারের ঈদযাত্রায় শুধুমাত্র বাস-মিনিবাসে ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হবে। এতে করে স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সই করা এক বিবৃতিতে ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানী পর্যবেক্ষণের এক সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা তুলে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে সংগঠনটি আরও জানায়, বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটিবাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। নৌ-পথের বেশিরভাগ রুটে এমন নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেলেও সরকার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে। এতে করে এবারের স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

সংগঠনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা ও দুরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়াও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর সিটি সার্ভিসের বাসে আরও প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াত হতে পারে বলে সংগঠনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। গত ১৪ মার্চ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের যাতায়াত, ঈদের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা, সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সামগ্রিক কার্যক্রম, পরিবহণ মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের গৃহীত ঈদযাত্রা সংশ্লিষ্ট নানান কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

এতে দেখা গেছে, সরকারি ঘোষণা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চালাচ্ছে। পর্যবেক্ষণকালে ঢাকা থেকে পাবনা নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার বাস ভাড়া ১২০০ টাকা, ঢাকা থেকে নাটোর নিয়মিত ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকার বাস ভাড়া ১২০০ টাকা, ঢাকা থেকে রংপুর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ১৫০০ টাকা, ঢাকা থেকে নোয়াখালীর নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে লক্ষীপুরের নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৭০০ টাকা, ঢাকা থেকে রামগঞ্জ নিয়মিত ৩৫০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ লোকাল বাসে ২৫০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা, ঢাকা থেকে খুলনা নিয়মিত ৫০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষীপুর নিয়মিত ৪০০ টাকার বাস ভাড়া ৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম থেকে ভোলা নিয়মিত ৪৫০ টাকার বাস ভাড়া ৯০০ টাকা, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়াও ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে ভাড়ার এই হার প্রতিদিন বাড়ছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৫২ আসন বিশিষ্ট লোকাল বাসও ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ভিন্ন হলেও অসাধু পরিবহণ মালিকেরা যাত্রীসাধারণের অসচেতনার সুযোগ নিয়ে ৪০ আসনের বাসভাড়া হারে ৫২ আসনের বাসেও একই হারে বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। সিএনজিচালিত বাস ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার হার ভিন্ন হলেও ঈদযাত্রার বহরে সবাই সমহারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চালাচ্ছে। কিছু কিছু নামি-দামি কোম্পানির বাসে কৌশলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেলে নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট নেই অজুহাত দেখিয়ে সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট কাটতে বাধ্য করছে। উত্তরবঙ্গের বগুড়া গেলে রংপুর, নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট কাটতে বাধ্য করতে দেখা গেছে। অন্যান্য রুটেও যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য থেকে দূরের টিকিট কিনতে বাধ্য করতে দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষণকালে বাসের চালক-সহকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার বাস-লঞ্চ ও বিভিন্ন গণপরিবহণের ভাড়া নির্ধারণকালে চালক-সহকারী ও ভাড়া আদায়কারীর বেতন-ভাতা ও দুই ঈদের বোনাস প্রতিদিনের আদায়কৃত ভাড়ায় ধার্য্য থাকলেও দেশের কোনো পরিবহণের মালিক তা পরিশোধ করেন না। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঈদ কেন্দ্রিক পরিবহণে চাঁদাবাজি বৃদ্ধি, পরিবহণ কোম্পানিগুলোর বাড়তি খরচের যোগান দেওয়া, পরিবহণের মালিক-চালক-সহকারী ও অন্যান্য সহায়ক কর্মচারিদের ঈদ বোনাস তুলে নেওয়া। পরিবহণ মালিকেরা বাড়তি মুনাফা লুফে নেওয়াসহ নানাকারণে বিভিন্ন শ্রেণির গণপরিবহণ ও ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট পরিবহণগুলো একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। সড়ক ও নৌ পথের পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক নেতা নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় মনিটরিং ভিজিল্যান্স টিমে যাত্রী সংগঠন না রাখায় এমন নৈরাজ্য থামাতে যাত্রীস্বার্থ দেখার কেউ নেই।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাসে ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর যাতায়াতে ৮৭ শতাংশ যাত্রীপ্রতি টিকিটে গড়ে ৩৫০ টাকা হারে বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে। সেই হিসেবে এবারের ঈদে দূরপাল্লার যাত্রীদের ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে।

এ ছাড়াও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সিটিবাসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রীর ৮৭ শতাংশ যাত্রী প্রতি টিকিটে গড়ে ৫০ টাকা হারে বাড়তি দিলে ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হবে। ফলে এবারের ঈদে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা শুধুমাত্র বাস-মিনিবাসে বাড়তি ভাড়া আদায় হবে। এই অতিরিক্ত ভাড়া নৈরাজ্যর কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, পরিবহণ চাঁদাবাজি আরেক দফা বাড়বে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে, অনিয়ম-দুর্নীতি, পরিবহণে বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনা বাড়বে। নিম্ন আয়ের লোকজন ভোগান্তিতে পড়বে। এখান থেকে উত্তরণে জন্য গণপরিবহণে ডিজিটাল লেনদেনে ভাড়া আদায় চালু করা, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ করা, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামরা পদ্ধতিতে প্রসিকিউশন চালু করা, আইনের সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

সারাবাংলা/এমএইচ/এইচআই
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর