ঢাকা: বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদের অধিবেশন মুলতবি করে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ আদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে নোটিশ উত্থাপন করেছেন। নোটিশ উত্থাপনের পর সংসদে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় অনির্ধারিত বিতর্ক হয় সরকারি দল এবং বিরোধীদলের মধ্যে।
রোববার (২৯ মার্চ) রাতে সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘স্পিকারের পরামর্শ অনুযায়ী আমি যথাযথভাবে নোটিশটি উত্থাপন করলাম। সেটি হচ্ছে—জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর আলোকে আমি সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বানের বিষয়ে নোটিশটি উত্থাপন করেছি। সেখানে বিস্তারিত আছে। আপনি আলোচনার জন্য এটি মঞ্জুর করবেন বলে বিশ্বাস করি।’
তার এই বক্তব্যের পর পরই সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথা অনুযায়ী তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন এবং ৭১ বিধি শেষ হওয়ার পরই যেকোনো বিষয় উত্থাপন করা হয়। বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করব, বিধি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে।’
এরপর আবার মাইক নেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সেদিন (১৫ মার্চ) জনাব স্পিকার বলেছিলেন, এ ধরনের আলোচনার বিষয় থাকলে প্রশ্নোত্তরের পরেই হবে। সে মোতাবেকই দাঁড়িয়েছি। আমি মনে করি, এটা আমার অধিকার ও দায়িত্ব। মনে করি, আপনি এইভাবেই গ্রহণ করবেন।’
এরপর চিফ হুইপের কাছে একমিনিট সময় চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বক্তব্য দিতে চাইলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা আপত্তি জানান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা স্পিকারের এখতিয়ার। তিনি সময় না দিলে আমি বসে পড়তে পারি।’ তখন ডেপুটি স্পিকার তার উদ্দেশে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, আপনি দয়া করে আপনার কথা শেষ করুন।’
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনি অনুমতি না দিলে… দিস ইজ মাই পয়েন্ট অব অর্ডার। আপনি পয়েন্ট অব অর্ডারের অনুমতি না দিলে বসে পড়তে পারি। আপনি দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেন, এটা আপনার ক্ষমতা।’ পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী আপনার বক্তব্য শেষ করুন।’ যদিও সংসদে সময় দেওয়ার এখতিয়ার চিফ হুইপের নেই, এটি একমাত্র স্পিকারের এখতিয়ার।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবাইকে সম্মান জানাতে চাই। বিরোধীদলীয় নেতা আলোচনার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। যেটা বিগত দিনে স্পিকার তাকে অনুরোধ করেছিলেন– আপনি বিধি মোতাবেক উত্থাপন করেন, বিধি মোতাবেক আপনাকে সময় দেওয়া হবে। আমাদের চিফ হুইপ যেটা বলেছেন, আমাদের রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর পর্ব ও ৭১ বিধির পরেই এ-জাতীয় মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেই কথাটাই বিরোধীদলীয় নেতাকে আপনি বলেছেন। আমার মনে হয় না কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। ৭১ বিধিতে সুযোগ দেবেন কি দেবেন না, সেটা আপনার এখতিয়ার। তবে এটা সংসদ সদস্যদের অধিকার। তারপরে বিরোধীদলীয় নেতা যদি নোটিশের বিষয়টা উত্থাপন করেন, তার বিরুদ্ধে আমাদেরও দুই-চার কথা থাকতে পারে।’
পরে মাইক নেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সংসদ কীভাবে গঠিত হচ্ছে, তা আমরা ভুলে যাচ্ছি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হয়েছিল। এখন সংসদের কার্যক্রম দেখলে মনে হচ্ছে, এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত, এর সুরাহা হওয়া উচিত। তারপরও নিয়মিত সব কার্যক্রম হওয়া উচিত। বিধি মোতাবেক বিরোধীদলীয় নেতা নোটিশ দিয়েছেন।’ গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনার অনুরোধ করেন তিনি।
পরে চিফ হুইপ বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত বিষয় নিশ্চয়ই আলোচনায় আসবে, আজকেই আলোচনা হতে পারে অথবা স্পিকার যেদিন নির্ধারিত করবেন, সেদিন আলোচনা হতে পারে। তিনি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এসেছেন। আমাদের দিক থেকে অসুবিধা নেই। ৭১ বিধি শেষে বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন।’
ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনার বিধিটি আমরা দেখছি। ৭১ বিধির পরেই নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।’ পরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘জনগণের রায়কে সম্মান দিতে হবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান আবারও মাইক নেন। তিনি বলেন, ‘আমি জেনেশুনে এ সময় বিষয়টি উত্থাপন করেছি। আমার জানা মতে, এটাই সময়। ৭১ বিধির আগে এটা উত্থাপন করার সুযোগ আছে। ৬৪ বিধি অনুযায়ী বিধিটা দেখতে পারেন। সেখানে উল্লেখ আছে।’
পরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘৬৪ বিধিতে উল্লেখ আছে, কিন্তু সংসদের রীতি, তা চিফ হুইপ বলেছেন, সে জন্য বলেছি—নোটিশটি আমরা পেয়েছি। ৭১ বিধির শেষে নোটিশটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেব।’ এরপর চিফ হুইপ বলেন, ‘স্পিকার চাইলে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি স্থগিত রেখে যেকোনো আলোচনা করতে পারেন।’
অবশেষে স্পিকার সংসদীয় বিধি অনুসরণ করে আগামী ৩১ মার্চ সংসদ মুলতবি রেখে দুই ঘণ্টা এই বিষয়ে আলোচনা হবে বলে রুল দেন। তারপরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার বার কথা বলতে চাইলে স্পিকার তাকে আর মাইক দেননি। তিনি মাইক ছাড়াই বেশ খানিকটা সময় কথা বলেন।
দিনের কার্যবিধি শেষ হলে আগামীকাল বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সংসদ মুলতবি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার।