Wednesday 08 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, জেলেদের বিক্ষোভ মিছিল

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২২ | আপডেট: ৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৪

জেলেদের বিক্ষোভ মিছিল।

কক্সবাজার: কক্সবাজার উপকূলে আবারও শুরু হচ্ছে সাগরে মাছ ধরায় টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সবধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

সরকার বলেছে, মাছের প্রজনন বাড়ানো ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি। তবে ভরা মৌসুমে এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন জেলেরা।

ট্রলার মালিক মো. কবির জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে উপকূলজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। জেলেরা জাল, ট্রলার ও সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছে। মাছ ধরার শেষ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছে অনেকে। তবে এই ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে অনিশ্চয়তার ছায়া। তার দাবি, তেল সংকট ও জলদস্যুতার প্রকোপের কারণে এরইমধ্যে জেলেদের পেশা ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

মহেশখালীর জেলে আইয়ুব আলী বলেন, ‘৫৮ দিন সাগরে যেতে পারব না। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, সেই চিন্তায় আছি।’

ফিশিং ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, তারা সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। তবে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও তুলেছে তারা।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলায় ৬৪ হাজার ২৩ জন জেলেকে সহায়তা দেওয়া হবে। প্রত্যেককে প্রায় ৭৮ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা জানালেন, ‘সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।’

কক্সবাজার সদর উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় ইউনিয়ন চৌফলদণ্ডী। মাছ ধরা, লবণ উৎপাদন এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের জনপ্রিয় খাবার ‘নাপ্পি’র জন্য পরিচিত এ অঞ্চল। এখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করে মাছ ধরার ওপর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েকমাস ধরেই তারা নানা সংকটে রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে সাগরে জেলিফিশের আধিক্য বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি তেলের সংকট এবং জলদস্যুর ভয়। এসব কাটিয়ে জেলেরা তবুও সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছিল, তখনই নেমে এল নিষেধাজ্ঞা।

টেকনাফের জেলে মো. রাসেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন সাগরে মাছ আছে, আবহাওয়াও ভালো। এই সময়েই নিষেধাজ্ঞা দিলে আমরা কীভাবে চলব?’

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের দাবি, বাংলাদেশের জলবায়ু ও সমুদ্রের অবস্থা ভারতের মতো নয়। অথচ নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ভারতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

তার ভাষ্য ‘এটা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। আমাদের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। এ নিষেধাজ্ঞা এক মাস পেছানো দরকার।’

এদিকে, নিষেধাজ্ঞা একমাস আগে দেওয়ার প্রতিবাদে এরইমধ্যে আন্দোলনে নেমেছে জেলেরা। কক্সবাজার সদরের চৌফলদণ্ডীসহ বিভিন্ন এলাকায় সোমবার (৬ এপ্রিল) বিকেলে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে।

এতে স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী নেতারা দাবি করে, ভরা মৌসুমে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে ক্ষতি হবে শত কোটি টাকার। সরকার যেন সময়টা পুনর্বিবেচনা করে।

ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, উপকূলের হাজারও পরিবারের জন্য সমুদ্রই একমাত্র আয়ের উৎস। ৫৮ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা তাদের জীবনে বড় চাপ তৈরি করবে। যদিও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়, তবু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন জেলেরা। খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর দাবিও জানান তিনি।

কুতুবদিয়ার জেলে সারওয়ার বলেন, ‘চাল পেলেও তো সব খরচ চলে না। ঋণ, ওষুধ, বাচ্চাদের পড়াশোনা সব কীভাবে চালাব?’

এদিকে, জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, ‘জাটকা আহরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদ বন্ধে সবাইকে সচেতন করতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

সভায় আরও বক্তব্য দেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুজয় পাল এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য। এ সময় কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, র‌্যাব ও মৎস্য সমবায় সমিতির নেতারাও উপস্থিত ছিল।

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা মূলত মাছের প্রজনন রক্ষার জন্য। তবে জেলেদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের দাবি, ঝড়-বৃষ্টির সময় মাছ বেশি প্রজনন করে। সেই সময়ই যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুজয় পাল বলেন, ‘বৈরি আবহাওয়ায় সাগরে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া, নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। বিষয়টি তারা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে বিকল্প কর্মসংস্থান, নগদ সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। নাহলে জেলেদের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়বে এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়বে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘কক্সবাজার উপকূলে এখন এক অদ্ভুত বাস্তবতা। একদিকে মাছের প্রাচুর্য, অন্যদিকে সাগরে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘জেলেদের এখন একটাই প্রশ্ন, এই ৫৮ দিন তাদের কীভাবে কাটবে? কারণ সমুদ্রই তাদের জীবন। কিন্তু সেই সমুদ্রেই এখন তাদের যাওয়া নিষিদ্ধ।’