চীন: সাংহাই। পূর্ব চীনের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এই সাংহাইয়ের একটি শিকুমেন বাড়িই বর্তমান চীনের বদলে যাওয়ার স্মৃতি বহন করে চলছে। যদিও সাংহাইয়ের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বাড়িটির চারপাশে রয়েছে আকাশচুম্বী ভবন। তার মধ্যেও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত বাড়িটির প্রতিটি ঘর ও চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তুলেছে সংগ্রাম ও তীব্র ইচ্ছাশক্তিকে।
১৯২১ সালের ২৩ জুলাই সাদামাঠা এই বাড়িটিতেই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়। প্রথমে এই বাড়িতে তেরো জন প্রতিনিধি গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। তারা একটি দর্শন তৈরি করেছিলেন। যা পরবর্তী সময়ে দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিচয়কে রূপান্তরিত করে।
চীনের সাংহাইয়ের বাড়িটি একটি ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বাড়িটি দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে গোপন বৈঠক শেষ পর্যন্ত আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল। একটি সংকীর্ণ পাথরের উঠোনে অনুষ্ঠিত একটি ছোট বৈঠকই এখনকার চীনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আতুড় ঘর শিকুমেন বাড়িটি একসময় এটি ছিল লি হানজুন এবং তার ভাই লি শুচেং-এর বাসস্থান, যা ৭৬ শিংয়ে রোডে অবস্থিত। এই বাড়িটির ছোট ছোট ঘরগুলো, সরু উঠোন, ইটের গাঁথুনি, খাড়া সিঁড়ি, আবদ্ধ নকশা—সবকিছুই সাংহাইয়ের বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের স্থাপত্যের স্মৃতি চিহ্ন বহন করছে। এখন এটি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের নীরব সাক্ষী।

কমিউনিস্ট পার্টির জন্মস্থান ‘শিকুমেন বাড়ি’ বদলে যাওয়া চীনের স্মৃতি বহন করছে। ছবি: সারাবাংলা
দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের এক ঝলক দেখানোর জন্য এই বাড়িতে অনুষ্ঠিত বৈঠকটির প্রেক্ষাপট ও কমরেডদের ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ কোণায় কোণায় রাখা হয়েছে। একটি টেবিলে তেরোটি চায়ের কাপ এবং মাঝখানে একটি অগ্নিকুণ্ড রাখা আছে। স্মৃতিসৌধের ভেতরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো দলের প্রতিষ্ঠার ঠিক আগের মুহূর্তটিকে ধারণ করা একটি জীবন্ত চিত্রপট তুলে ধরেছে। একটি সাধারণ কাঠের টেবিলের চারপাশে তেরোটি ব্রোঞ্জ-রঙা মূর্তি বসে আছে। তাদের অভিব্যক্তি চিন্তাশীল ও উত্তেজনায় ভরা। এটি কোনো নিশ্চিন্ততার ঘর নয়। এটি প্রশ্ন, তর্ক এবং এখনো চূড়ান্ত না হওয়া সিদ্ধান্তের একটি ঘর।
বৈঠকে অংশ নেওয়া মহারথিদের মধ্যে ছিলেন মাও সে-তুং, যিনি তখন ছিলেন কেবলই একজন প্রতিনিধি। ইতিহাস তাকে পরবর্তীকালে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তখনও তিনি তা হয়ে ওঠেননি। আরেকজন যেন কোনো বক্তব্য তুলে ধরার ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে আছেন। আরেকজন হাত জোড় করে শুনছেন। অন্যদের দেখে মনে হচ্ছে তারা গভীর চিন্তায় মগ্ন। ভাস্কর্যগুলোর খসখসে ও রুক্ষ গড়ন সেগুলোকে এক ধরনের অদম্য শক্তি, প্রায় অসম্পূর্ণ এক আবহ দিয়েছে, যেন সেগুলো তখনো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এই বাড়িটির একটি কক্ষে উজ্জ্বল অক্ষরে ঐতিহাসিক তারিখ লেখা এক অন্ধকার পটভূমির বিপরীতে স্থাপিত সজ্জা। এটি ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা থেকে প্রকাশ্য বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিতে থাকা এই তেরোজন ব্যক্তির নীরব তীব্রতাকে তুলে ধরে। যা সম্মিলিত ‘চিন্তাভাবনার’ এই ‘স্থবির মুহূর্ত’ সাংহাইয়ে পার্টির ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠার আগের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের এক শক্তিশালী স্মারক হিসেবে কাজ করে।
প্রকৃতপক্ষে এই বাড়িটিকে কোনো জাদুঘরের প্রদর্শনীর চেয়ে এক শতাব্দী ধরে থেমে থাকা কোনো কথোপকথনের মাঝে হেঁটে যাওয়ার মতো মনে হয়। ঘরগুলোর চারপাশে কাঁচের পেছনে রাখা আছে ভঙ্গুর সব নথি— প্রাথমিক ইশতেহার, হাতে লেখা নোট, মার্ক্সবাদী রচনার অনুবাদ। সেখানে থাকা পুস্তকের পাতাগুলোর বয়স হয়েছে, কিনারাগুলো জীর্ণ ও বিবর্ণ। তবুও সেগুলোর ভেতরের ভাবনাগুলো স্পষ্ট রয়ে গেছে, যেখানে একদল ব্যক্তি এক উত্তাল দেশের জন্য ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।
বাড়িতে থাকা প্রদর্শনীগুলো দেখে মনে হয়েছে, এই সংগ্রাম কোনো বাধা ছাড়া এগোয়নি। সেখানকার প্যানেলগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- কীভাবে ফরাসি কনসেশনে সভাটি পুলিশের সন্দেহ আকর্ষণ করেছিল, ফলে প্রতিনিধিরা ছত্রভঙ্গ হতে বাধ্য হন। পরিকল্পনাগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আলোচনা মাঝপথে থেমে যায়। কিন্তু সমাবেশ সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। এরপরও এগোতে থাকে সংগ্রাম।

কমিউনিস্ট পার্টির জন্মস্থান ‘শিকুমেন বাড়ি’ বদলে যাওয়া চীনের স্মৃতি বহন করছে। ছবি: সারাবাংলা
প্রদর্শনীটি একটি পরিবর্তন দর্শকদের একটি আবছা আলোয় আলোকিত গ্যালারিতে নিয়ে যায়, যেখানে একটি সাধারণ পর্যটকবাহী কাঠের নৌকা চোখে পড়ে। এটি ঝেজিয়াং-এর জিয়াক্সিং-এর নানহু হ্রদের সেই নৌযানের একটি প্রতীকী পুনর্নির্মাণ, যেখানে কংগ্রেসের চূড়ান্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের কড়া নজর এড়িয়ে প্রতিনিধিরা পুনরায় একত্রিত হন এবং তাদের কাজ সম্পন্ন করেন। একবছরের মধ্যেই এর সদস্য সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০-তে পৌঁছেছিল।
প্রদর্শনীগুলোতে সাংহাইয়ের কারখানা ও ডকের শ্রমিক আন্দোলনগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে তত্ত্বের সঙ্গে কর্মের মিলন ঘটেছিল, শ্রমিকরা সংগঠিত হয়েছিল, ধারণাগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ধীরে ধীরে গতি সঞ্চার হয়েছিল। এর পর আসে মোড় ঘোড়ানো মুহূর্তগুলো। গঠিত জোটও ভেঙে গিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ সংঘাত ঐক্যের পরীক্ষা নিয়েছিল। লং মার্চ নেতৃত্ব ও কৌশলকে নতুন রূপ দিয়েছিল। ১৯৪৯ সাল নাগাদ কমিউনিস্ট পার্টি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করে, যা দেশটির গতিপথে একটি নির্ণায়ক পরিবর্তন চিহ্নিত করে।
এই আখ্যান এখানেই থেমে থাকে না। এটি পুনর্গঠন, সংস্কার এবং উন্মুক্তকরণের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। দেং জিয়াওপিংয়ের অধীনে অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন আসে এবং বাজার-ভিত্তিক সংস্কার প্রবর্তন করা হয়, যা চীনের অর্থনীতি এবং বিশ্বে তার অবস্থানকে রূপান্তরিত করে। স্মৃতিসৌধের পরবর্তী অংশগুলো এই কাহিনীকে বর্তমান পর্যন্ত নিয়ে আসে, যার মধ্যে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বও অন্তর্ভুক্ত, যার অধীনে দেশটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে।
শিকুমেন জাদুঘরটি ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে একটি স্মৃতিসৌধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬১ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রীয় পরিষদ সিপিসি’র প্রথম জাতীয় কংগ্রেসের স্থানটিকে জাতীয় পর্যায়ে সুরক্ষিত একটি প্রধান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে স্থানটি পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের জন্য বন্ধ রয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেসের নবনির্মিত স্মৃতিসৌধটি ২০২১ সালের ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়।
নতুন প্রদর্শনী হলটির মোট ভবন এলাকা প্রায় ৯ হাজার ৬০০ বর্গমিটার। যার মধ্যে রয়েছে মূল প্রদর্শনী হল, বক্তৃতা হল, দর্শনার্থী পরিষেবা কেন্দ্র এবং অন্যান্য পরিষেবা। এখানে ‘যুগান্তকারী সূচনা: চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি চলছে। তখন থেকেই প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী এটি দেখতে ভিড় করছেন।
প্রদর্শনীটি ‘আসল অবসান ও প্রতিষ্ঠা মিশন’- এই মূলভাবের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, যা সাতটি বিভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলো- প্রাক-প্রদর্শনী হল, জাতীয় অস্তিত্বের সংগ্রাম, জনজাগরণ এবং মার্কসবাদের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ, প্রাথমিক দলীয় গোষ্ঠীগুলোর বিস্তার, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আবির্ভাব ও উত্থান, গৌরবময় পথের অগ্রযাত্রা এবং উপসংহার। নতুন বিভাগগুলোতে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ইন্টারেক্টিভ স্ক্রিনগুলো দর্শকদের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দং বিউসহ প্রাথমিক ব্যক্তিত্বদের জীবনী অন্বেষণ করার সুযোগ করে দেয়।