Wednesday 13 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

টিকা সংকটে হামে শিশু মৃত্যু, দায় এড়াচ্ছে সবাই!

তাহমিনা ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ মে ২০২৬ ১০:০৬

হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যু বেড়েই চলেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ মে পর্যন্ত সারাদেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪২৪ শিশু। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ৩৫৬ জন এবং নিশ্চিত হামে ৬৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় সারাদেশে হাম সন্দেহে শনাক্ত শিশুর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৭ এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ২৪ শিশু।

মাত্র দুই মাসে এত শিশুর মৃত্যু! এর দায় নিতে চাচ্ছে না কেউই। দায়িত্বপ্রাপ্তরা একে-অন্যের ওপর দায় ও দোষ চাপাতে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষদের একটা শ্রেণি দোষ চাপাচ্ছে বর্তমান সরকারসহ মাস দুয়েক আগে বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। আবার একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা দায় চাপাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার ও বর্তমান বিএনপির সরকারের ওপর। কিন্তু দায় আসলে কার?

বিজ্ঞাপন

দেশের টিকাদান ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে এমন সতর্কবার্তা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগকে আরও গভীর করে তুলছে। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, শহরাঞ্চলে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে রয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় হামসহ বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংক্রমণও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে- এই সংকট কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা? নাকি এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এমন এক পর্যায়, যা ক্রিমিনাল নেগলেজেন্স বা ফৌজদারি অবহেলার আওতায় পড়তে পারে?

আইনজীবী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যখাতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে নেই। বরং, এটি এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। একসময় গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এই কর্মসূচি শিশু মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। যেমন- টিকা সরবরাহে অনিয়ম ও ঘাটতি, কোল্ড চেইন ব্যবস্থার দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট, নগর বস্তিতে কার্যকর নজরদারির অভাব, সচেতনতা কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যখাতে নীতিগত অস্থিরতা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক ভাসমান ও নিম্নআয়ের পরিবার স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় টিকা পাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘টিকা দেরিতে দেওয়া মানে অনেক ক্ষেত্রে টিকা না দেওয়ার সমান। এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ, হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো রোগ দ্রুত ছড়ায়। এই রোগগুলো কমিউনিটির ইমিউনিটি দুর্বল করে দিলে পরিস্থিতি মহামারির দিকে যেতে পারে।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কি পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানত? যদি জেনেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ক্রিমিনাল নেগলেজেন্স বা দণ্ডনীয় অবহেলার আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে সরাসরি ক্রিমিনাল নেগলেজেন্স শব্দবন্ধ না থাকলেও অবহেলার কারণে মৃত্যু, দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার বিষয়ে একাধিক ধারা রয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা যদি নাগরিকের জীবনহানির কারণ হয় তাহলে অন্তত বিচারিক তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহীন চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র জানে যে, টিকা না পেলে শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তারপরও যদি সরবরাহ, তদারকি ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকে। তাহলে সেটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তৈরি করে।’

তবে তিনি এটাও বলেন, ‘আদালতে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করা অত্যন্ত জটিল। কারণ, সেখানে দেখাতে হবে কার সিদ্ধান্ত, কোন অবহেলা এবং কীভাবে তা সরাসরি মৃত্যুর কারণ হয়েছে।’

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে চিকিৎসাসেবার কথা বলা হয়েছে। ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এসব নীতিনির্ধারক নির্দেশনা আদালতে সরাসরি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রয়োগযোগ্য নয়। তবুও রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায় অস্বীকারের সুযোগ কমে যায়।

মানবাধিকারকর্মী বলছেন, প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারণ, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাম বা পোলিওর মতো রোগ প্রতিরোধের কার্যকর টিকা বহু বছর ধরেই বিদ্যমান। মানবাধিকার গবেষক তাসলিমা খাতুনের ভাষায়,
‘যখন একটি শিশু টিকা না পেয়ে মারা যায়, সেটি কেবল একটি চিকিৎসাগত ব্যর্থতা নয়। এটি সামাজিক বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির সংকটের প্রতীক।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু জরুরি ভিত্তিতে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ তদন্ত, টিকা ঘাটতির প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, নগর দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ কর্মসূচি চালু, স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিশুস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে নিয়ে আসতে হবে।

এই সংকটকে কেবল স্বাস্থ্যখাতের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, এখানে প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিক অর্থাৎ শিশুদের ন্যূনতম সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে? আর সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুকে ঠেকাতে ব্যর্থ এক গভীর রাষ্ট্রীয় অবহেলার চিত্র।

সারাবাংলা/টিএম/পিটিএম