ঢাকা: অনলাইন জুয়া, অনলাইন বাজি, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন এবং ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনায় শাস্তির বিধান রেখে ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইন বাতিল করে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে তা পরীক্ষা করে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
বিলে অনলাইন জুয়া পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের সাজার বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ জুয়ায় সম্পৃক্ত হলে ২ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এদিকে বিলে ম্যাচ ফিক্সিং বা ম্যাচ পাতানোর অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধে প্রস্তাব করা হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের।
বিলটি উত্থাপনের সময় সংসদের বৈঠক পরিচালনা করছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন। বিদ্যমান ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ রহিত করে নতুন আইন করার প্রস্তাব করা হয়েছে বিলে।
এছাড়া আদালত চাইলে ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচার, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে বিলে।
কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটি জুয়ার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর প্রচার করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বিলে ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস, ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, তথ্য গোপন বা ব্লক করা প্ল্যাটফর্ম পুনরায় চালুর অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
জুয়ার অর্থ লেনদেন, ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর বা গোপন করাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভুয়া সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতি ব্যবহার করে জুয়া বা বেটিং চালালে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে বিলে।
এ অপরাধ সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বিলে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন সব অপরাধ হবে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য। এছাড়া অনলাইন জুয়া, অনলাইন বাজি এবং সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। অন্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে।
মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে ভ্রাম্যমান আদালতেও এসব অপরাধের বিচার করা যাবে।
এদিকে বিলে পুলিশকে আদালতের পরোয়ানা নিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তির কম্পিউটার, সার্ভার, অ্যাপ, ডেটাবেজ, কার্ড, পাশা, টোটালাইজেটর বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।তথ্য মুছে ফেলা বা নষ্ট করার আশঙ্কা থাকলে কারণ লিপিবদ্ধ করে তাৎক্ষণিক তল্লাশি, জব্দসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে।
সরকার বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জুয়া সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ, চ্যানেল বা ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। মিরর সাইট, ক্লোন সাইট বা বিকল্প ডোমেইন ব্যবহার করলেও তা ব্লক করা যাবে।
জুয়ার কাজে ব্যবহৃত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এমএফএস, পেমেন্ট গেটওয়ে, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট বন্ধের নির্দেশ দিতে পারবে আদালত।
বিলে জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, অর্থপাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ ডেটাবেজ তৈরির বিধান রাখার কথা রয়েছে।
এই ডেটাবেজে অপরাধীর তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, সিম, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক হিসাব, ওয়ালেট, ডিভাইস, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
এছাড়া এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন, ফেসিয়াল রিকগনিশন ও ঝুঁকিভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে।
বিলে এআই মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন, রিস্ক স্কোরিং, ট্রানজেকশন মনিটরিং ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া শনাক্তের ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এআইভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন, ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ডিভাইস, ওয়ালেট বা অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করা যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, দেড় শ বছরের পুরোনো আইনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে অনলাইন বেটিং, ভিপিএন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তরুণ সমাজকে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতেই এই যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী জুয়া নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এই বিলের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।