ঢাকা: বিদ্যুৎ বিলের মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের মোট ২৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিলের প্রয়োজন হবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় বিরোধীদলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘সরকার আপাতত পুরো টাকা মওকুফ করতে না পারলেও গ্রাহকদের জন্য বিকল্প পথ খোলা রেখেছে; কোনো গ্রাহক যদি নিজ খরচে মিটার কিনে নেন, তবে তাকে আর কোনো মাসিক ভাড়া দিতে হবে না।’
এ ছাড়া ভূতুরে বিল ও বিলিং সংক্রান্ত যাবতীয় অনিয়ম চিরতরে বন্ধ করতে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদ্যুৎ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিগত সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতাকে বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিমন্ত্রী জানান, সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারের কাছে সুস্পষ্ট স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যখন আশ্বস্ত করে বলেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, তখন সরকারের পুরো দল একযোগে বলছে ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’।”
এ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে মেয়াদ শেষে অবসরে যাওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং এ সপ্তাহ থেকেই কোনো প্রকার ক্যাপাসিটি চার্জ না দিয়েই সেখান থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জরুরি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার এরই মধ্যে এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সংকটে বন্ধ থাকা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চলতি সপ্তাহেই চালু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি জানান, সমুদ্র ও ভূ-ভাগে অনুসন্ধান জোরদার করতে গত মে মাসে শুরু হওয়া অফশোর বিডিং রাউন্ডের পাশাপাশি ১০৬টি কূপ খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টির কাজ এখন সরাসরি মাঠে চলছে। গ্যাস সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে এ বছরের মধ্যেই দুটি নতুন এফএসআরইউ চুক্তির পাশাপাশি মাতারবাড়িতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে।
জ্বালানি তেলের আধুনিকায়ন ও শোধন সক্ষমতা বাড়াতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার মাধ্যমে ক্রুড অয়েল পরিশোধনের ক্ষমতা বর্তমানের ১৫ লাখ টন থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে শিল্পোদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের মাত্র এক শতাংশ শুল্কে রুফটপ সোলার প্যানেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের জন্য অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট মওকুফের ঘোষণা দেন তিনি।
উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রির সুবিধা চালু করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি খাত সম্পূর্ণরূপে সংকটমুক্ত হবে বলে সংসদে আশ্বস্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।