ঢাকা: ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে উন্নত অর্থনীতির দেশ জাপান বড় একটি সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশ কোনোভাবেই জাপানের শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারছে না। যদি কোনোভাবে সুযোগও আসে, শুধুমাত্র ভাষার সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে জাপানি ভাষা শেখানোর দক্ষ শিক্ষকের অভাবও অনেকাংশে দায়ী।
শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বহু চুক্তি ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়োগকর্তাদের চাহিদামাফিক যথেষ্ট সংখ্যায় জাপানি ভাষা জানা দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছি না আমরা। সে কারণে আকর্ষণীয় এই বাজারটি এখনও অধরা।
জানা গেছে, জাপানে ক্রমাগতভাবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সেই কারণে জাপানে এখন শ্রমিকের দারুণ অভাব। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, সেবাযত্ন (কেয়ারগিভিং), কৃষি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদনের মতো নানা ক্ষেত্রে তাদের বিদেশি কর্মী দরকার। কিন্তু কাজের উপযোগী ভাষা ও যোগাযোগের দক্ষতা না থাকায় অনেক বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থী প্রাথমিক ধাপগুলোই পার হতে পারছেন না।
সরকারের নানা উদ্যোগ আর একের পর এক চুক্তির পরও এই সমস্যা কাটছে না। দক্ষ জাপানি ভাষা শিক্ষকের অভাবে এই বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি বড় করা যাচ্ছে না। অদক্ষ শ্রমিকের তো কথাই নেই, আমাদের দেশের প্রশিক্ষিত শ্রমিকরাও জাপানী ভাষার দখল নিতে পারছে না। এমনকি এক্ষেত্রে আমাদের দেশের তুলনায় মিয়ানমার-নেপালও এগিয়ে আছে। সেখানে আমরা বিশ্বে শ্রমশক্তি রফতানির বড় অংশীদার হয়েও পেরে উঠছি না।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফরের পর বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই সফরে বাংলাদেশিদের জন্য চাকরির সুযোগ বাড়ানো, জাপানি ভাষা শিক্ষার মান উন্নত করা, ইন্টার্ন ভিসার নিয়ম সহজ করা এবং ভাষা শিক্ষকের সংকট কাটাতে জাপানের সাহায্য চাওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে। এর আগে বিগত অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলেও জাপানের শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে বড় ঘোষণা এসেছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
জানা গেছে, বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ দিতে ২০০৫ সালের জুলাইয়ে দুই দেশ একটি চুক্তি করেছিল। কিন্তু এর পরের আট বছরে জাপানে যেতে পেরেছিলেন মাত্র ৪১ জন কর্মী। যা বাংলাদেশের মতো একটি শ্রমিক রফতানিকারক দেশ হিসেবে খুবই নগন্য।
২০১৫ সালে জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘আইএম জাপান’-এর সঙ্গে ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণের জন্য আরেকটি চুক্তি হয়। এর পর ২০১৭ সালে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের ওপর একবছরের একটি কর্মসূচি নেওয়া হলেও, কোনোটি থেকেই বড় ও স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি। ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট নির্দিষ্ট দক্ষ কর্মী স্কিমের আওতায় কর্মী পাঠানো সহজ করতে দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। কিন্তু ভাষা প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই ও লোক নেওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় অগ্রগতি আটকে যায়।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ১৬৩ জন বাংলাদেশি জাপানে যান। ২০১৯ সালে ৪০০ জনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও জুলাই মাসের মধ্যে মাত্র ১১৯ জনকে পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। বিএমইটি দেশের ২৭টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে ৪০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী নেওয়ার ব্যবস্থা করে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকেও ভাষা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে কাজের গতি ছিল সীমিত।
জাপানের অভিবাসন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টেকনিক্যাল ইন্টার্ন, নির্দিষ্ট বিষয়ের দক্ষ কর্মী এবং ইঞ্জিনিয়ার ভিসায় মোট ১১ হাজার ৭৫৬ জন বাংলাদেশি দেশটিতে কাজ করছেন। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা মনে করেন, ‘ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়াতে ঘাটতি থাকার কারণেই জাপানের শ্রমবাজার ধরতে এই ধীরগতি।’
তিনি সম্প্রতি এক কলামে লিখেন, ‘দক্ষতা, জাপানি ভাষার জ্ঞান এবং কাজের চাহিদামাফিক প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিশাল এই তরুণ জনশক্তি থাকার পরও দেশটি এটাকে স্থায়ী কর্মসংস্থানে রূপ দিতে পারেনি।’
কাজের নির্দেশ বোঝা, সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা এবং দৈনন্দিন জীবন ভালোভাবে চালানোর জন্য জাপানি ভাষা জানা খুবই জরুরি। অনেক কাজের জন্য অন্তত এন-ফোর লেভেলের দক্ষতা লাগে, আর এন-থ্রি বা এন-টু জানা থাকলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য অবশ্যই এমন সব পরীক্ষায় পাস করতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের (আইএমএল) পরিচালক মোহাম্মদ আবসার কামাল সারাবাংলাকে জানান, কাজ আর কোম্পানি ভেদে ভাষার চাহিদাও আলাদা হয়। তিনি বলেন, ‘জাপানসহ অন্যান্য শ্রমবাজারে নির্দিষ্ট মাত্রার ভাষা জানা জরুরি। জাপানির ক্ষেত্রে এন-ফোর বা এন-থ্রি দরকার হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে নিয়োগকর্তা ও খাতের চাহিদার ওপর।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু সাধারণ জাপানি ভাষা শেখালেই হবে না। কর্মীদের তাদের কাজের সঙ্গে মানানসই শব্দ ও কথোপকথনও শেখাতে হবে। এজন্য আলাদা ট্রেনিং ম্যানুয়াল বা বই তৈরি করা দরকার। খরচ বেশি হওয়া, ঢাকার বাইরে ভালো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকা এবং শিক্ষকের অভাব গ্রামাঞ্চলের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বড় বাধা।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জেএলপিটি এন-ফাইভ কোর্সের জন্য ২৫ হাজার টাকা, এন-ফোরের জন্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং এন-থ্রির জন্য ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এই কোর্সগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস চলে। বাংলাদেশ-জাপান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনে একসঙ্গে এন-ফাইভ ও এন-ফোর কোর্সের খরচ ৩৫ হাজার টাকা। কিছু সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বই, ভর্তি বা পরীক্ষার ফি ছাড়া মাত্র এক হাজার টাকায় কোর্স করার সুযোগ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যাওয়ার আগে ভালো প্রস্তুতি নিলে প্রবাসীরা আরও বেশি আয় করতে পারবেন। দেশেই যদি ভালো দক্ষতা অর্জন করে যাওয়া যায়, তবে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। ভাষা ও কাজে দক্ষ কর্মীরা বেশি বেতন পান, যা দেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণও বাড়িয়ে দেয়।’
এদিকে আইএমএল পরিচালক কামাল জাপানি ভাষা জানা স্নাতকদের স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, সরকারের কাছে ভালো বই ও পাঠ্যক্রম তৈরির জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, আলাদা একটি সেল গঠন, বাজেট দেওয়া এবং সব কাজের মধ্যে মিল রেখে চলার বিষয়েও কাজ চলছে।
এদিকে, ভাষা ও কাজের প্রশিক্ষণ বাড়ানোর জন্য সম্প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। গত ২৫ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহাদি আমিন জানান, জাপানি শিক্ষকদের জন্য বাংলাদেশের ভিসা ও থাকার ব্যবস্থা সহজ করার কাজ চলছে।
প্রশিক্ষিত কর্মীদের জাপানি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত করতে একটি ডাটাবেজ বানানো হচ্ছে। যারা জেএলপিটি এবং জেএফটি-এর মতো জাপানি ভাষার পরীক্ষা দিয়েছেন, তাদের তথ্য সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে।
এ ছাড়া, পরীক্ষাকেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে জাপানের মান অনুযায়ী ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক যারা ভাষা শিখতে চান, তাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
আগে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষকদের প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা দেওয়া হলেও এখন তাদের মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের আরও ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। গত অক্টোবরে জাপান ফাউন্ডেশনের একজন প্রশিক্ষক বাংলাদেশে এসে স্থানীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন।
জাপানের সহায়তায় ‘নির্দিষ্ট দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষাসহ এক লাখ সম্ভাব্য অভিবাসীকে জাপানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা’ নামের একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে এক লাখ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসূচির আওতায় ৩৬টি কলেজে এন-ফাইভ কোর্স চালু আছে, যার মধ্যে ১৬টিতে এন-ফোর পড়ানো হয়।
এ ছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অ্যাডভান্সড অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ জাপান ইনস্টিটিউট, ব্যাংক ইউনিভার্সিটি, জেইউএবিসহ প্রায় ২০০ জায়গায় জাপানি ভাষা শেখার সুযোগ রয়েছে।