ঢাকা: ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরে নতুন বাংলাদেশের যাত্রায় আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের নিয়ে একটি দল গঠন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে— জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এক অচলায়তন ভেঙে দিয়েছিল, সেই তরুণদের হাত ধরেই রাজনীতিতে নতুন দলের প্রবেশ। বিগত একটি বছর যেন ঝোড়ো গতিতে এগিয়ে চলা এই দলের উত্থান, বিতর্ক আর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেই কেটেছে। রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের জন্ম দেওয়া এই দলটি একবছরের পথচলায় পার করেছে একের পর এক অধ্যায়।
জন্ম ও আত্মপ্রকাশে নতুন দিনের ডাক
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রচলিত রাজনীতির বাইরে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এক বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে এনসিপি’র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেদিনই আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও দ্রুত ২১৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটি ৪ মার্চ সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং রায়ের বাজারে চব্বিশের অভ্যুত্থানের শহিদদের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতকেন্দ্রিক গতানুগতিক রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা।
সাংগঠনিক-নির্বাচনি প্রস্তুতি ও তড়িঘড়ি পথচলা
এনসিপি গত একবছর ধরে নির্বাচনকে সামনে রেখে বড়ধরনের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে এলেও, তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো— এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে না পারা। কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত চলছে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েই। তার পরেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য তারা প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখেনি। দলটি প্রথম ধাপে ১২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। যদিও পরবর্তী সময়ে আট দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোটে গিয়ে ৩০টির মতো আসনে তাদের নির্বাচনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন আসনে দলের নেতাদের প্রচার-প্রচারণা দেশের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দিচ্ছে।
প্রতীকের লড়াই ও নিবন্ধন: ‘শাপলা’ থেকে ‘শাপলাকলি’
নিবন্ধনের প্রক্রিয়া ছিল এনসিপির জন্য এক কঠিন লড়াই। গত ২২ জুন তিনটি প্রতীকের আবেদন নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করেন মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। কিন্তু ‘শাপলা’ প্রতীকটি জাতীয় প্রতীক হওয়ায় এবং অন্য একটি দলের দাবি থাকায় ইসি এটি বরাদ্দ দিতে চায়নি। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এক্ষেত্রে এনসিপি’র প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, শেষমেশ ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে নিবন্ধন ও প্রতীক চূড়ান্ত হয়। গত ৩ ডিসেম্বর দলের নিবন্ধন সনদ গ্রহণ করেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
জোটের রাজনীতি: বলয় গড়ার কৌশল
এনসিপি শুরু থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি জোটে না গিয়ে নিজস্ব বলয় গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৭ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠনের ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম। এই জোটে আছে— জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। জোটের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করছেন নাহিদ ইসলাম। তবে, নির্বাচনের বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনে শেষ মুহূর্তে তাদের কৌশলে পরিবর্তন আসে। ২৮ ডিসেম্বর বাংলামোটরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন যে, তারা জামায়াতে ইসলামীসহ ৮দলীয় জোটের সঙ্গে গিয়ে নির্বাচন করছে। এই ঘোষণার পরই দলের বেশ কিছু শীর্ষ নেত্রী, যেমন— তাসনিম জারা, তাজনুভা, ঝুমাসহ অনেকে পদত্যাগ করেন।
অভ্যন্তরীণ এই ভাঙাগড়ার মাঝেও সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দিয়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এনসিপি জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটে ৩০টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দলটি সারাদেশে মোট ৪৭টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন: উত্তাপ ছড়ানো বছর
এনসিপি অল্প সময়ে জনসমর্থন পেলেও একাধিক বিতর্কেও জড়িয়েছে। বিশেষ করে গত একবছরে বিএনপি ও জামায়াতকে লক্ষ্য করে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ ছড়িয়েছে। তারা গতানুগতিক রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের দাবিতে গত ৮ মে রাতে হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য’র ব্যানারে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর, ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার রায় না আসা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত আসে। এই ঘটনাও ছিল রাজনৈতিকভাবে আলোচিত।
তবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দলটি নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে এনসিপি নেতৃত্ব। এসব বৈঠকে মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলেও তারা ভারতবিরোধী অবস্থানে অনড়। সম্প্রতি ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য ভূ-রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঞ্চ প্রস্তুত, এবার অগ্নিপরীক্ষা
উত্থানের বছর পেরিয়ে এখন নির্বাচনের মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টি। তরুণদের এই নতুন রাজনৈতিক শক্তি দেশের মানুষের মাঝে যেমন বিপুল আগ্রহ সৃষ্টি করেছে, তেমনি জোটের রাজনীতিতে বারবার কৌশল পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ ভাঙন তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (ঢাকা-১১), আখতার হোসেন (রংপুর-৪), হাসনাত আবদুল্লাহ (কুমিল্লা-৪), নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী (ঢাকা-১৮)-এর মতো উল্লেখযোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে কেমন ফল করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যে দল যাত্রা শুরু করেছিল প্রচলিত দলীয় বন্দোবস্ত ভাঙার দাবি নিয়ে, সেই দলটিই এখন বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনে ১০ দলীয় জোটে শামিল। তাদের নির্বাচনি প্রতীক ‘শাপলাকলি’ কি পারবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু আনতে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে নতুন বছরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ফল পর্যন্ত।