রংপুর: রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসার বার্ষিক আয় ২ কোটি টাকার বেশি এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় শতকোটি টাকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় নিজের ও স্ত্রী সেলিনা জাহানের পেশা ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করেছেন তিনি।
নগদ অর্থের দিক থেকে স্ত্রী এগিয়ে থাকলেও অস্থাবর সম্পদে এমদাদুল নিজে শীর্ষে। এই বিপুল সম্পদের বিবরণ তার ‘শিল্পপতি’ পরিচয়কে আরও জোরালো করেছে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সাথে চরম পার্থক্য তৈরি করেছে—যেমন বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী প্রগতি বর্মণ তমার বার্ষিক আয় মাত্র ২৫ হাজার টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী, এমদাদুল হক ভরসার বার্ষিক আয় ২ কোটি ৬৭ হাজার ৫৪২ টাকা। এর মধ্যে স্থাবর সম্পত্তির ভাড়া থেকে ১১ লাখ ৩৪ হাজার ৯০০ টাকা, শেয়ার/সঞ্চয়পত্র/ব্যাংক জামানত থেকে ৯৩ লাখ ৫১ হাজার ৩০৮ টাকা এবং ব্যবসা থেকে ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৩৩৪ টাকা। স্ত্রীর বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এমদাদুলের নগদ অর্থ ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৮৫ টাকা। স্ত্রীর ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৮ টাকা।
ব্যাংকে এমদাদুল হকের জমা ৫৮ লাখ ৬৫ হাজার ৯৮৭ টাকা, স্ত্রীর ২৩ হাজার ১৩০ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মূল্য তার ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮৬৫ টাকা এবং স্ত্রীর ৫ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪১৮ টাকা। স্থাবর সম্পদে রয়েছে ৭ দশমিক ৪১ একর কৃষিজমি, ১৬ দশমিক ৬৮ একর অকৃষিজমি, একটি বাণিজ্যিক ভবন এবং ১১টি অ্যাপার্টমেন্ট, যার মোট মূল্য ৬০ কোটি ৬৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৬২ টাকা। স্ত্রীর কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। ব্যাংক ও শেয়ার ঋণ তার ১৪ কোটি ৬০ লাখ ৬৫ হাজার ২৩৩ টাকা, স্ত্রীর ৬৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৪ টাকা। তবে তারা ঋণখেলাপি নন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমদাদুল হক ভরসা কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ সারাই ডারারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত রহিম উদ্দিন ভরসার ছেলে, যিনি বিশিষ্ট শিল্পপতি, সাবেক সংসদ সদস্য এবং রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি। ১৯৭৯ সালে এই আসনে বিএনপি থেকে জয়ী হয়েছিলেন রহিম উদ্দিন, যিনি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৮ সালে দলে যোগ দেন। এরপর এ আসনে বিএনপির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু এবার ছেলেকে ঘিরে দলটি ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। ২০১৮ সালের বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে এমদাদুল প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং আওয়ামী লীগের টিপু মুনশির (সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী) কাছে পরাজিত হলেও লক্ষাধিক ভোট পান।
সম্প্রতি নির্বাচনি কার্যক্রমে এমদাদুলের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২ জানুয়ারি মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে এ আসনে ১০টি মনোনয়নের মধ্যে তিনটি বাতিল এবং সাতটি বৈধ হয়, যার মধ্যে তারটিও রয়েছে। প্রচারণায় তিনি বলেছেন, ‘রংপুর-৪ আসন তারেক রহমানকে উপহার দেব।’ গতকাল (৩ জানুয়ারি) এমদাদুল হক গ্রামাঞ্চলে প্রচারণা চালান, যেখানে রাস্তাঘাট মেরামত, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং শিল্পকারখানা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
এ আসনে অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আখতার হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ মার্কসবাদী) প্রগতি বর্মণ তমা, বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জল চন্দ্র রায়, জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ্ মো. মাহবুবার রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জাহিদ হোসেন।
যদিও এনসিপির আখতার হোসেনের সমর্থনে জামায়াতের প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছেন, যা তার প্রচারণাকে শক্তিশালী করেছে। তবে মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় এনসিপি এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে তুমুল বিবাদ হয়েছে, যেখানে আখতার হোসেন জাপাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে আখ্যায়িত করেন। এ আসনে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ছয় বার, জাতীয় পার্টি চার বার এবং বিএনপি একবার জয়ী হয়েছে। এবারের নির্বাচনে এমদাদুলের উত্থান বিএনপির জন্য নতুন আশা জাগিয়েছে, যা এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়েছে।