ঢাকা: বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক বলেছেন, দেশে ফিরে আসার পর আমি সাভারে গিয়েছিলাম, আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছে, নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, একটি আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, প্রতিটি প্রজন্মই মনে হয় কিছু একটি গাইডেন্স চাইছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ২২ তারিখ থেকে আমাদের সব পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে যাব। শুধু সমালোচনা করার জন্য নয়, আপনাদের কাছ থেকে এমন সমালোচনা আমরা যাতে পাই, দেশের মানুষের যে সমস্যাগুলো আছে, সেই সমস্যা যাতে সমাধান করতে যেন সক্ষম হই। আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে সেই প্রত্যাশা আপনাদের কাছে রাখছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে। অবশ্যই আমরা ৫ আগস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না। আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি, আমার একপাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা। একইসঙ্গে আমার এক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা, আর আমার আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ঘটনা। এগুলো বোধহয় শুধু আমার জন্য নয়, যারা আমার দলের নেতাকর্মী ও সদস্য এবং সামগ্রিকভাবে পুরা দেশের মানুষের সামনে এই দু’টি উদাহরণ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘হিংসা, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, একটি মানুষ, একটি দল বা যেভাবে আমরা বিবেচনা করি, তার পরিণতি কী হতে পারে আমরা দেখেছি ৫ আগস্ট। আমি সেজন্যই সকলকে অনুরোধ করব, দলমত নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু আমরা যদি চেষ্টা করি তাহলে সেই মতপার্থক্যটাকে মতপার্থক্যের মধ্যে রেখে আলোচনার মাধ্যমে সেটির সমাধান।। মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই মতবিভেদের পর্যায়ে চলে না যায়। বিভেদ হলে, জাতিকে বিভক্ত করে ফেললে, কী হতে পারে আমরা দেখেছি। অনেকের মুখে অনেক কথা শুনি, হতাশার কথা আমরা শুনি। কিন্তু, তারপরও আশার কথা হচ্ছে যে, তাদের কাছে ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে।’
তিনি ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যের পরিপ্রক্ষিতে বলেন, ‘আমি দেশে অনেক দিন থাকতে পারিনি। কী কারণে সে প্রসঙ্গে আপনাদের কম-বেশি ধারণা আছে। তবে সারাক্ষণই দেশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। দেশের মানুষের সাথে কী হয়েছে? এখানে মাহমুদুর রহমান সাহেব বলেছেন একটি উদাহরণ দিয়ে। উনার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই আমি বলতে চাইছি, উনার রক্ত মাখা ছবি এখনো আমার চোখের সামনে ভাসে। কাজেই উনার সঙ্গে কী হয়েছে আমি যেমন জানি, রুহুল আমিন গাজী (ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রয়াত সভাপতি) সাহেবের সঙ্গে কী হয়েছে, যেভাবে উনি মৃত্যুবরণ করেছেন জেলের মধ্যে, সেটি আমি জানি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আমার ৬০ লাখ নেতাকর্মী এবং তার থেকে আরেকটি হৃদয় বিদারক আমার জন্য সেটি হচ্ছে, আমার মায়ের সঙ্গে কী হয়েছে। কাজেই এই ঘটনাগুলো যদি আমরা এককরি, তাহলে যারা দেশে ছিলেন, আপনারা অবশ্যই আমার থেকে একটু বেটার জানবেন। তবে আমি একদম যে জানি না, বোধহয় বিষয়টি তা নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যারা রাজনীতিবিদ, আমাদের কাছে হয়তো অনেক প্রত্যাশা। সব প্রত্যাশা হয়তোবা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই সবগুলোকে আমাদের সামনে রেখে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, তাহলে আমরা জাতিকে একটি সঠিক ডিরেকশনে নিয়ে যেতে সক্ষম হব।’
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি পানির সমস্যা নিয়েও তিনি কথা বলেন। তারেক রহমানের ধারণা, এখন যেভাবে চলছে, এভাবে যদি চলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর হার্ডলি ২০ বছর পর ঢাকা শহরে কোনো জায়গা থেকে পানি আমরা পাব না। আমাদের বুড়িগঙ্গা নদী সম্পূর্ণরকম পলিউটেড, ১০০ শতাংশ পলিউটেড। শীতলক্ষ্যা নদী ৫০ শতাংশের মতো পলিউটেড। এখন মেঘনা নদী থেকে পানি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, কয়েকটা প্রজেক্টে কাজ হচ্ছে। কিন্তু এটার পানিও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পলিউটেড হয়ে যাবে। ঢাকা শহরে যে সাড়ে তিন কোটি মানুষের বাস করছে, এরা পানি পাবে না। সারা দেশে যদি এই সমস্যা শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি কত ভয়াবহ হতে পারে! আমার মনে হয়, এই বিষয়গুলো নিয়ে এখন আলোচনা হওয়া উচিত। সেটি সংসদে হোক কিংবা সেমিনারে।’
কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘২০ কোটির মতো মানুষ এই দেশে বড় অংশ হচ্ছে তরুণ সমাজ। এই তরুণ সমাজের সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি দেশের ভেতরে হোক, অথবা বাইরে। আমরা যদি এটি করতে সক্ষম না হই, তাহলে ৫ আগস্ট, ৯০ এর আন্দোলন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা- প্রত্যেকটি প্রত্যাশা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
নারী-পুরষের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গতবছর সাত হাজারের মতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে। আমার কাছে বিষয়টি খুব অস্বাভাবিক লাগে। আমার ধারণা, আপনারা যদি একটু চিন্তা করেন আপনাদের প্রত্যেকের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক লাগবে। কিন্তু ঘটনাটি ঘটছে। এই অস্বাভাবিক ঘটনা কেন ঘটবে?’
কৃষকদের অবস্থা তুলে ধরে তারেক বলেন, ‘আমার দলের বিগত সরকারের কথা বলব, কৃষকদের জন্য সেই সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এত বিশাল সংখ্যাক কৃষক যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করছে, অন্নের সংস্থান করছে, এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়- সেটা ভাবতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে, আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা হবে। আমি যে ফ্যামিলি কার্ডটি বলেছিলাম, সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে- এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা।’
কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, সবার জন্য চিকিৎসা সুবিধা, তরুণ সমাজের কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, আইটি সেক্টর, উদ্যোক্তা তৈরি করা, আইটি পার্কগুলোকে নতুনভাবে সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলা, কন্টেট তৈরির কাজে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে আরও সহজ করার কথাও বলে তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের শীর্ষ পর্যায়ের সাংবাদিকসহ বিএনপি বিটের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। অনুষ্ঠানে সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বক্তব্য দেন।