ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র বাকি একমাস। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতকে ঘিরে দু’টি জোট ভোটের মাঠে নেমেছে। যদিও এরই মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় সব আসনে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এমনকি মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে প্রতীকের অপেক্ষায় প্রার্থীরা। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে চলছে আপিল নিষ্পত্তি, সেইসঙ্গে চলছে প্রার্থিতা প্রত্যাহার । এর পরই প্রতীক নিয়ে মাঠে নামবেন প্রার্থীরা।
অপরদিকে এখনো মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পারেনি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটটি। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও আসন ভাগাভাগি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো। ফলে এসব দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বেশ উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যার প্রতিফলন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দাবি অনুযায়ী তারা আসন না পাওয়ায় জোটে থাকা না থাকার বিষয়টি এখন রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমান দর কষাকষিতে ১১ দলীয় জোট টিকবে কি না তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব–নিকাশ।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আর মাত্র আটদিন বাকি। ফলে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সমন্বয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে জোট বা রাজনৈতিক বোঝাপড়া টিকবে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই সমীকরণ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে দল দু’টির নেতারা বলছেন, তাদের মধ্যে শিগগিরই সমঝোতা হয়ে যাবে। এক বাক্স নীতিতে তারা অটল রয়েছেন। মিডিয়া নানাভাবে ঝড় তুললেও চরমোনাই-জামায়াত এক আছে। জোটের আসন বণ্টন প্রায় চূড়ান্ত। দুয়েকদিনের মধ্যেই দেশবাসীর সামনে তা তুলে ধরা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল হালিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘১১-দলীয় জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আসন বণ্টন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। যে আসনে যে দলের প্রার্থীর জয়লাভের বেশি সম্ভাবনা থাকবে, তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। এখানে কেউ কাউকে আসন দেবে না।’
সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে আন্দোলন ও নির্বাচনের রাজনীতিতে সক্রিয়। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ইসলামপন্থী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং বড় রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বরাবরই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এই ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশলই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সম্প্রতি সরকারবিরোধী রাজনীতিতে মাঠের শক্তি বাড়াতে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াত–চরমোনাই জোটকে অনেকেই কৌশলগত সমঝোতা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে নির্বাচনে আসন সমন্বয় বা যৌথ আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন বোঝাপড়া উভয়পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, এই জোটের পথে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু ও রাজনৈতিক আন্দোলনে দুই দলের অবস্থান এক ছিল না। জামায়াত যেখানে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বিরোধী জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুগপৎ আন্দোলন করেছে। সেখানে চরমোনাই পীরের দল বড় রাজনৈতিক জোটে যুক্ত না হয়ে আলাদা কর্মসূচি পালনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্ট পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত যেমন বিএনপি ছেড়ে ভোটের রাজনীতিতে নামে। তেমনি ইসলামী আন্দোলনও ভোটের মাঠে সুবিধা নেওয়ার জন্য জামায়াতের সঙ্গে জোট বাধতে আগ্রহী হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলের নেতারা এক হয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে চাইলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। জামায়াতের রয়েছে শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো, আর চরমোনাইয়ের রাজনীতিতে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব বেশি। এই দুই ধারা একসঙ্গে দীর্ঘদিন চলতে পারবে কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন।
ভোটের অংকও জোটের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর। দুই দলের ভোটব্যাংক আংশিকভাবে একই হওয়ায় অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে। এতে জোটের লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আবার সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, ইসলামপন্থী শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে মাঠের রাজনীতিতে আলাদা প্রভাব তৈরি করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে এই দুই দলের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য ছোটদলগুলোর ভোট যুক্ত হয়ে বিএনপি জোটকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে জামায়াত–চরমোনাই জোট আপাতত কৌশলগত প্রয়োজন থেকে আলোচনায় থাকলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনি সমীকরণ এবং পারস্পরিক ছাড়–সমঝোতার ওপরই নির্ভর করবে এই জোট ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ও টেকসই হয়। বর্তমান বাস্তবতায় বলা যায়, এটি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাবের ফল হতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে দুই পক্ষকেই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুই দলেরই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘কোন দল কয়টা আসন নেবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই জায়গায় এসে একটু থমকে আছি। অনেকগুলো আসন চূড়ান্ত হয়েছে। চেষ্টা চলছে বাকিগুলো দুয়েকদিনের মধ্যে হয়ে যাবে।’ বিভিন্ন মিডিয়ায় ‘কোন দল কত আসন পাচ্ছে’ বলে যেসব খবর প্রকাশ হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা লেখে তারা অনুমাননির্ভর লেখে। কারা কত আসন পাবে এটা কেউ জানে না।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আসন সমঝোতা নিয়ে সবদলের মধ্যে আলোচনা চলছে। আশা করা যায়, শিগগিরই ঘোষণা আসবে।’ জোট টিকবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এক বাক্স নীতিতে আমরা সবাই নির্বাচনের অংশ নিতে পারব।’
জামায়াত-চরমোনাই জোটের অন্য দলগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
এদের মধ্যে জামায়াত ২৭৬টি, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি এবং এলডিপি ২৪টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। সমঝোতা হলে প্রতিটি আসনে সব দলের একজন প্রার্থী থাকবে। অন্যরা তাকে বিজয়ী করতে কাজ করবে। এমন নীতিতে তাদের সমঝোতা।
এই জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে আমির ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সংসদে যে দলের বেশি আসন থাকবে সেই দলের প্রধানই প্রধানমন্ত্রী হবেন।’ অপরদিকে দলটির নায়ের আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের একই প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মেজরিটি আসন পেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে সিদ্ধান্ত নিতে কোনো অসুবিধা হবে না।’ আর খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও জামায়াত আমিরের মতো বলেন, ‘যে দলের বেশি আসন থাকবে তাদের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হবেন।’