ঢাকা: পুরোনো ও অকার্যকর রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি বলেন, দেশের বিদ্যমান ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কাঠামো এতটাই দুর্বল যে সেখানে প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আয়োজিত এক সংলাপে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। একই দিনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের (বিসিএফসিসি) কার্নিভাল হলে ‘নাগরিক ইশতেহার ২০২৬: জাতীয় নির্বাচন ও রূপান্তরের প্রত্যাশা’ শীর্ষক খসড়া ইশতেহার উপস্থাপন সংলাপেও তিনি তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সংলাপটির আয়োজন করে সিপিডি, সহযোগিতায় ছিল প্রাপ্তি ও সংলাপ।

ডা. তাসনিম জারা বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল ও জটিল। এখানে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে যিনি জবাবদিহি করবেন, তাকেই আবার নিয়োগ দেন সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যার জবাবদিহি নেওয়ার কথা। ফলে প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
তিনি বলেন, যারা জনগণের ভোটে সংসদে যান, তারা সাংবিধানিকভাবেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ হারান। এর ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও তারা কার্যত দলের প্রতিনিধি হয়ে থাকেন, জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে সংসদ কীভাবে কার্যকরভাবে ক্যাবিনেটকে জবাবদিহির আওতায় আনবে—সে প্রশ্নও তিনি তোলেন।
তাসনিম জারা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ক্যাবিনেটের জবাবদিহি সংসদের কাছে থাকার কথা। কিন্তু সংসদের সদস্যরা যদি দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে না পারেন, তাহলে সংসদের হাত-পা বাঁধা থাকে। তখন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা যদি দুর্নীতিতে জড়ান, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট, আর প্রেসিডেন্টকে সেই নিয়োগ দিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে। ফলে দুর্নীতির অভিযোগ যদি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ওঠে, সেখানে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বাস্তব সুযোগ থাকে না। কারণ যাদের জবাবদিহি করার কথা, তারাই নিয়োগকর্তা হিসেবে যুক্ত থাকেন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, এমপি, মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন, তখন জবাবদিহি কে চাইবে—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও বাছাই কমিটিতে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতি কমিশনের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ যদি দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়ান, তখন যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা, সেসব প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। কারণ শেষ পর্যন্ত যাকে জবাবদিহির আওতায় আনার কথা, সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও কাঠামোর সঙ্গে জড়িত।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের অধিকারও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতা থেকেই তিনি মনে করেন, কেবল দলীয় রাজনীতির ভেতরে থেকে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি এনসিপি থেকে সরে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কার ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। জনগণের প্রতিনিধি যদি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে না পারেন, তাহলে গণতন্ত্র কেবল একটি কাঠামোগত নামেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।