Friday 16 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইচ্ছাকৃত অবহেলা ছিল: ডা. এফ এম সিদ্দিক

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:১৬ | আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২১

শোকসভায় কথা বলছেন ডা. এফ এম সিদ্দিক। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গুরুতর ও ইচ্ছাকৃত অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক প্রফেসর ডা. এফ এম সিদ্দিক। তিনি বলেন, এটি নিছক গাফিলতি নয়, বরং willful negligence বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা, যা অমার্জনীয় অপরাধ।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় চিকিৎসক সমাজের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

শোকসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, চিকিৎসায় এই অবহেলাই ধীরে ধীরে তার লিভার ফাংশনের ভয়াবহ অবনতি ঘটিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এমনকি এটা খালেদা জিয়াকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

প্রফেসর ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯–সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বর্তমান মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিল। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা গভীর বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পান যে, তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। অথচ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া চিকিৎসার ছাড়পত্রে তার রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের জন্য Methotrexate নামের একটি ওষুধ নিয়মিত সেবনের নির্দেশ ছিল এবং ভর্তি থাকা অবস্থায়ও সেই ওষুধ তাকে খাওয়ানো হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মেডিকেল বোর্ড ওই ওষুধ বন্ধ করে দেয়।

তিনি জানান, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে রিউমাটয়েড আর্থাইটিসে ভুগছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শেই Methotrexate সেবন করতেন। একই সঙ্গে তার (MAFLD) বা ফ্যাটি লিভার ডিজিজও ছিল। এই প্রেক্ষাপটে Methotrexate একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ।

প্রফেসর সিদ্দিক বলেন, এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ম্যাডামের লিভারের অসুখ নির্ণয় করা মোটেই কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। এর জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ারও প্রয়োজন নেই। Methotrexate সেবন করলে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে লিভার ফাংশনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো পর্যবেক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ওষুধ বন্ধ করে ন্যূনতম একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করে লিভারের অবস্থা মূল্যায়ন করতে হয়।

কিন্তু তিনি অভিযোগ করেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং Methotrexate বন্ধও করেননি।

তিনি বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে ম্যাডাম সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন কোনো চিকিৎসকের মাধ্যমে বেডসাইডে সহজেই Point of Care Ultrasound (POCUS) করা যেত। অন্ততপক্ষে Methotrexate বন্ধ করা ছিল চিকিৎসকদের অবশ্য কর্তব্য, যা করা হয়নি।

অনেকের প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, অনেকেই জানতে চান, ম্যাডামকে কি ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল? তার উত্তর হলো—Methotrexate–ই ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। সেই অর্থে এটি তার লিভারের জন্য স্লো পয়জনের মতো কাজ করেছে।

বক্তব্যের একপর্যায়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আজ দেশের লক্ষকোটি মানুষের বুকে এক গভীর আফসোস কাজ করছে-সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য যিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তিনি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন। যদি তিনি দেখে যেতে পারতেন মানুষ আবার নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন। তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস ও আর্থাইটিসের চিকিৎসায়ও অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।

তার মতে, ম্যাডামের চিকিৎসাজনিত অবহেলার অন্তত তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে-সরকার কর্তৃক গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তারা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তায় কিনা; ভর্তি থাকা অবস্থায় কোন কোন চিকিৎসক তার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সেখানে চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কিনা; এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে ম্যাডাম আইনজীবীর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন কী কারণে সেটি সম্ভব হয়নি এবং কারা এতে বাধা দিয়েছিল।

সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তিনি বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিএমইউর সব ডকুমেন্ট আইনগতভাবে জব্দ করার দাবি জানান। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

সরকারের প্রতি আশা প্রকাশ করে প্রফেসর ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, ম্যাডামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি—justice delayed is justice denied। এখন আর বিলম্ব নয়, সত্য উদঘাটনই জাতির দাবি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর