রাজবাড়ী: দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে এই নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীতেও বইছে ভোটের আমেজ। পাঁচটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভা মিলে রাজবাড়ী জেলা। এই জেলার সংসদীয় আসন দু’টি এবং মোট ভোটার সংখ্যা ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৪ লাখ ৮৮হাজার ১৩৭ জন। নারীর নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, শিক্ষা, জেলার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিবে এমন প্রার্থীতে ভোট দিতে চান এখানকার নারীরা। এমন কয়েকজন নারী ভোটারের সঙ্গে কথা বলেছেন সারাবাংলার রাজবাড়ী ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট সুজন কুমার বিষ্ণু। এখানে তাদের সেই প্রত্যাশা ও দাবির কথাগুলো তুলে ধরা হলো—
ফারহানা জাহান মিনি নামের এক নারী ভোটার বলেন, ‘রাজবাড়ী একটি সুন্দর, সাজানো-গোছানো, পরিপাটি শহর। এই শহরটিকে আরও প্রাণবন্ত করতে হবে। আমাদের রাজবাড়ীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় নেই, মেডিকেল কলেজও নেই। ফলে এখানকার ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করতে জেলার বাইরে যায়। কাজেই এদিকে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া, এখানে বড়ধরনের কর্মসংস্থান নেই, ইন্ড্রাস্টিজ নেই। যার কারণে এখানে বেশি লোক কাজ করতে পারে না- এদিকেও নজর দিতে হবে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়াতে পদ্মা সেতু চাই আমরা। এটা আমাদের রাজবাড়ী বাসীর প্রাণের দাবি।’
তানজীয়া আলম মিশু নামের এক নারী ভোটার জানান, নারীরা যাতে সবসময় নিরাপদ থাকতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। ভোট কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে যেন ভোট দিতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। নারীদের চলাচলে নিরাপদ ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এগুলো যাতে না হয় সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
তানিয়া নামের এক নারী ভোটার বলেন, ‘আমরা সুন্দর একটা রাজবাড়ী চাই। যেখানে দুর্নীতি, চোরাচালান এগুলো থাকবে না। দেশের অবস্থা এতটাই ভয়ংকর যে, মেয়েদের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। নারী-পুরুষের বৈষম্য আমরা চাই না। পারিবারিক বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, সংগঠনের বৈষম্য- এই ভেদাভেদগুলো দূর করতে হবে।’
রাজবাড়ী সরকারি কলেজের অনার্স (ইতিহাস বিভাগ) ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অরুণিমা প্রামাণিক বৃষ্টি বলেন, ‘মেয়েদের নিরাপত্তা ও তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এটা নিশ্চিত হলে রাজবাড়ীর সমাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রতিটি মেয়ের ঘরে-বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যাতে তারা বাধাহীনভাবে শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মমুখী হয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারে। নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।’
ফারজানা আক্তার নামের এক ভোটার জানান, রাজবাড়ীতে একটি আধুনিক সরকারি হাসপাতাল নেই, সেটা করতে হবে। ভাঙা রাস্তা সংস্কার, নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণ, ছোট ইন্ডাস্ট্রি বা ইকোনমিক জোন, উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা প্লাটফর্ম, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া, কৃষি পণ্যের নায্যামুল্য নিশ্চিত, নারীদের জন্য কর্মসংস্থান পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশ, মাদকবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, কিশোর গ্যাং নির্মুল, সমাজের বঞ্চিত ও দারিদ্র শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, স্টুডেন্টদের জন্য পার্টটাইম চাকরি ব্যবস্থা করাও জরুরি।
তরুণ ভোটার সেতু ইয়াসমিন বলেন, ‘ঢাকা বিভাগের অংশ হয়েও রাজবাড়ী জেলা এখনো অবকাঠামো ও অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে। প্রতিবছর রাজবাড়ীতে নদী ভাঙন দেখা দেয়। এতে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়। এর স্থায়ী সমাধান করতে হবে। নারীবান্ধব কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন করতে হবে। স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়ন করতে হবে। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালটি জেলার মানুষের প্রধান ভরসা হলেও এটি প্রায়ই চিকিৎসক ও ওষুধের সংকটে জর্জরিত থাকে । প্রসূতি মায়েদের জরুরি চিকিৎসায় এখনো আমাদের ফরিদপুর বা ঢাকায় ছুটতে হয়। আমরা চাই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন একটি মেডিকেল কলেজ ও উন্নত হাসপাতাল, রেল ও সড়ক যোগাযোগ আধুনিকায়ন। দৌলতদিয়া ঘাটের আধুনিকায়ন এবং পদ্মা সেতুর সুফল যেন রাজবাড়ীর প্রতিটি মানুষ ভোগ করতে পারে সেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বন্যা সুলতানা নামে এক নারী বলেন, ‘রাজবাড়ীর সড়ক আরও উন্নত করা, রেলস্টেশন আধুনিকীকরণ ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সেইসঙ্গে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজ, কারিগরি ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। নতুন জনপ্রতিনিধিকে অবশ্যই স্কুল–কলেজে শিক্ষক সংকট দূর করা, উপজেলা পর্যায়ে ভালো হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা নিশ্চিত করা, কৃষি ও নদীভিত্তিক উন্নয়ন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, পদ্মা নদী ভাঙন রোধ, আধুনিক সেচ ও সংরক্ষণ সুবিধা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবার দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি পদ্মা নদী ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র, পার্ক, স্টেডিয়াম এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও নির্মাণ করাও জরুরি।’