ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যেগুলো শুধু একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং একটি রূপান্তরের প্রতীক হয়ে অমর হয়ে থাকে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম। তিনি ছিলেন একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সেনানায়ক, রাষ্ট্রপ্রধান ও রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে নতুন এক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তক। তিনি সংঘাত, সাহস ও সংকটের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছেন। যার প্রভাব আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতিতে গভীরভাবে অনুভূত হয়।
সৈনিক হয়ে ওঠা
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়িতে জন্ম নেওয়া জিয়াউর রহমানের শৈশব কেটেছে তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের নানা ভূগোল আর রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। কলকাতা ও করাচিতে পড়াশোনা শেষে তরুণ জিয়া বেছে নেন সামরিক জীবন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান ও ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার পেশাদার সৈনিকজীবন। ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সাহসিকতা তাকে এনে দেয় ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব। কিন্তু এই পদকপ্রাপ্ত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত পাশে দাঁড়ান— একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ঘোষণা দিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন জিয়াউর রহমান আর কেবল একজন সেনা কর্মকর্তা নন, তিনি হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার কণ্ঠে ভেসে আসে স্বাধীনতার ঘোষণা। এই ঘোষণা শুধু সামরিক বিদ্রোহের আহ্বান ছিল না; এটি ছিল ভীতসন্ত্রস্ত জাতির জন্য সাহসের প্রথম উচ্চারণ। মুক্তিযুদ্ধে তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন এবং ‘জেড ফোর্স’ গঠন করে সংগঠিত সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যুদ্ধশেষে ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত এই সেনানায়ক হয়ে ওঠেন জাতির কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ একের পর এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। ১৯৭৫ সালের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ৭ নভেম্বরের পরিবর্তনের পর তিনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এই পর্যায়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ক্ষমতাকে কেবল সামরিক শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং, রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগী হন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ‘বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন’।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
বিএনপি প্রতিষ্ঠা
একদলীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে তিনি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ খুলে দেন। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং বিরোধী কণ্ঠের অস্তিত্ব নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের অংশ। এই কারণে তার আমলে সংবাদপত্রের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল হয়, রাজনৈতিক পরিসর তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত হয়।
উন্নয়ন দর্শন: গ্রাম থেকে রাষ্ট্র
জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রাম। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, খাল খনন, সেচ প্রকল্প, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা- সবকিছুর লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। তিনি আত্মনির্ভরতার কথা বলতেন, উৎপাদনের রাজনীতির কথা বলতেন। তার বিখ্যাত আহ্বান, আরও বেশি উৎপাদন, আরও বেশি কাজ—যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য বাস্তববাদী দিকনির্দেশনা ছিল। কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির চেষ্টা চালানো হয়, বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া হয়।
নারী ও সমাজ
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নারী উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পুলিশে নারীর অন্তর্ভুক্তি, মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, সংসদে সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি— এসব পদক্ষেপ তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় উল্লেখযোগ্য ছিল। সেইসঙ্গে যৌতুকবিরোধী আইন, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রাথমিক ও বয়স্ক শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ সামাজিক রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে।
জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তা
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রীয় উপাদান। তিনি জাতীয় পরিচয়কে কেবল ভাষাভিত্তিক নয়, রাষ্ট্রভিত্তিক ও সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক দেখতে চেয়েছিলেন। সংবিধানে আনা পরিবর্তনগুলো— ধর্মীয় বিশ্বাসের উল্লেখ, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সংহতির নীতি, সমর্থন ও সমালোচনা উভয়ই জন্ম দিয়েছে। তবে এতে সন্দেহ নেই, এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন এক দিকে মোড় নিয়েছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তার সহধর্মিনী সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়া
দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার স্বপ্ন থেকেই সার্কের ধারণা উঠে আসে। মুসলিম বিশ্ব, চীন, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন তিনি। তার কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী নির্ভরতা থেকে বহুমাত্রিকতায় নিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ড ও অসমাপ্ত অধ্যায়
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে থেমে যায় তার জীবন। চার বছরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন—সময়টা ছিল অল্প, কিন্তু প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। অনেকের কাছে তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক, আবার অনেকের কাছে বিতর্কিত শাসক—এই দ্বৈত মূল্যায়নই হয়তো তার রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রমাণ।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘শহিদ জিয়া ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক। মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক। তার দেশপ্রেম, সাহস, সততা আর সহজ-সরল-অনাড়ম্বর জীবনযাপন আজও আমাদের জন্য আদর্শ। সমাজে যেকোনো ব্যক্তির মহৎ চরিত্র গঠনে শহিদ জিয়া হচ্ছেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রমিত আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, “জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ‘সিন্থেসিস’ বা সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো- তিনি রাজনীতিকে ড্রয়িংরুম থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। যখন দেশ একদলীয় শাসনের আবর্তে ছিল, তখন তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক আকাশকে উন্মুক্ত করেছিলেন। তার ‘১৯ দফা’ কর্মসূচি ছিল আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ব্লু-প্রিন্ট। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে তার ভূমিকা আজও অনস্বীকার্য।’
শেষ কথা
আজ ১৯ জানুয়ারি এই বীর নেতার জন্মবার্ষিকী। ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে এসে শহিদ জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং তিনি একটি জাতীয় চেতনার নাম। তার ব্যক্তিগত সততা আর অনাড়ম্বর জীবন আজও এদেশের তরুণ রাজনীতিকদের জন্য এক বড় শিক্ষা। ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জিয়াউর রহমান তার কর্ম ও দর্শনের মাধ্যমে টিকে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।