চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম নগরীতে তিন মাস আগে ছাত্রদল কর্মী সাজ্জাদ খুনের ঘটনায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী বাদশাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, একসময়ের যুবলীগ কর্মী থেকে ভোল পালটে যুবদলকর্মী সেজে বাদশা নগরীর বাকলিয়া এলাকায় কিশোর-তরুণদের একটি গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাতে নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ সড়কে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বাদশা এবং তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার চারজন হলেন- মো. বাদশা (২২), শাহরিয়ার ইমন (২৫) মো. মারুফ (২৫) এবং মো. আকাশ (২২)। তারা নগরীর বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কিশোর মজুমদার সারাবাংলাকে জানান, তিন মাস আগে বাকলিয়ায় ছাত্রদলকর্মী সাজ্জাদ খুনের মামলার এজাহারের ৭ নম্বর আসামি বাদশা। তার বিরুদ্ধে মোট ১৪টি মামলা আছে বাকলিয়া থানায়। বাদশার সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া বাকি তিনজন তার নেতৃত্বাধীন ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ সক্রিয় সদস্য। তবে, তারা সাজ্জাদ খুনে জড়িত নন।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর রাতে নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডের মদিনা আবাসিকের সামনে এক্সেস রোডে যুবদলের দুই গ্রুপে দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে মো. সাজ্জাদ (২৩) নামে ছাত্রদলের এক কর্মী নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত আট জন। নিহত সাজ্জাদ চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারী এবং নগর যুবদলের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশার গ্রুপের কর্মী ছিলেন। নগরীর বাকলিয়ার তক্তারপুল এলাকায় তাদের বাসা।
সেসময় পুলিশ ও স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে লাগানো ব্যানার ছেঁড়া নিয়ে বিরোধ থেকে যুবদলের এমাদাদুল হক বাদশা ও বোরহান উদ্দিনের অনুসারীদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। সেখানে মেয়র শাহাদাত হোসেন ও নগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি গাজী সিরাজের ছবি ব্যবহার করে ব্যানার লাগিয়েছিলেন স্থানীয় যুবদল নেতা বোরহান উদ্দিন। অবৈধ ব্যানার-পোস্টার অপসারণে মেয়রের নির্দেশনা থাকায় বাদশার অনুসারীরা নিজ উদ্যোগে সেগুলো খুলে ফেলতে গিয়েছিলেন। সেই ব্যানার খোলার সময় উভয়পক্ষে গোলাগুলি হয়।
এসআই কিশোর সারাবাংলাকে জানান, গ্রেফতার বাদশা যুবদল নেতা বোরহান উদ্দিনের গ্রুপের কর্মী। বোরহানও সাজ্জাদ হত্যা মামলার আসামি। তবে তিনি জামিনে আছেন।
সাজ্জাদ হত্যাকাণ্ডের পর সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেছিলেন, বোরহান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবদলের পরিচয় দিলেও তারা একসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) করতেন। এদের নেতৃত্বে বাকলিয়া এক্সেস রোডসহ আশপাশের এলাকায় বিশাল একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছিলেন মেয়র।
পুলিশ সূত্রমতে, বোরহান উদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে বাকলিয়া থানা যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবে আলোচিত ছিলেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহেল, যিনি একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বোরহানের সঙ্গে যুবলীগে আশ্রয় নেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বোরহান ও সোহেল নিজেদের যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। এরপর বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় থাকা দলটির কর্মী সরোয়ার হোসেন বাবলার গ্রুপে যোগ দেন দু’জন। বাবলা গত বছরের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে বাবলার পৃষ্ঠপোষকতায় বোরহানের গড়ে তোলা একাধিক কিশোর গ্যাং এখনও সক্রিয় আছে, যার একাংশের নেতৃত্বে আছেন বাদশা।
এসআই কিশোর মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘বোরহান, সোহেলসহ কয়েকজন মিলে বাকলিয়া এক্সেস রোডে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। আমরা এরই মধ্যে তাদের গড়ে তোলা গ্রুপের বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছি। সর্বশেষ বাদশাসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতে হাজিরের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’