রংপুর: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে এবার পোস্টারের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে প্রার্থী ও দলগুলো বিকল্প হিসেবে ফেস্টুন, ডিজিটাল ব্যানার, লিফলেট ও বিলবোর্ডের দিকে ঝুঁকেছে। তাইতো রংপুর নগরী এখন একটি ব্যস্ত কর্মশালায় পরিণত হয়েছে। নগরীর সেন্ট্রাল রোড, ফায়ার সার্ভিস মোড়, মাহিগঞ্জের স-মিল এবং পায়রা চত্বরের ছাপাখানাগুলোতে শ্রমিকেরা দিনরাত এক করে কাজ করছেন কাঠ কাটা, ফ্রেম তৈরি এবং ব্যানার ছাপানোয়। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তন নির্বাচনি প্রচারকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে। সেইসঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার নির্বাচনকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রতীক বরাদ্দ করেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হবে নির্বাচনি প্রচার। এসব উপকরণ দিয়ে নগরী রঙিন হয়ে উঠবে। তাইতো প্রচার শুরুর অপেক্ষায় রংপুর নগরীতে এখন কাঠ কাটা, ফ্রেম তৈরি ও ব্যানার ছাপানোর কাজে ব্যস্ততা চরমে।
নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের নভেম্বরে জারি করা ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য আচরণবিধি, ২০২৫’ অনুসারে, পোস্টার নিষিদ্ধ করার মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশ রক্ষা এবং প্রচারকে আরও সংযত ও ডিজিটালমুখী করা। এছাড়া, পলিথিন বা পিভিসি-জাতীয় ক্ষতিকর উপাদান নিষিদ্ধ করায়, কাগজ বা কাপড়ভিত্তিক উপকরণের ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়া, ড্রোন ব্যবহার, বিদেশে প্রচার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করাও নিষিদ্ধ, যা নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছতার দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার করাতকলগুলোতে দেখা গেছে, শ্রমিকেরা কাঠের ফ্রেম তৈরিতে ব্যস্ত। নাইম নামে এক শ্রমিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় ফেস্টুনের চাহিদা বেড়েছে। আমরা দিনে ২০০-৩০০টি ফ্রেম তৈরি করছি, নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়ে।’
পায়রা চত্বর ও প্রেসক্লাব সংলগ্ন ছাপাখানাগুলোতে ডিজিটাল প্রিন্টার মেশিনগুলো চলছে অবিরাম। বোরহান নামে এক ছাপাখানার মালিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিটি ব্যানার ঠিকঠাক ছাপা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হচ্ছে। স্তূপ করে রাখা ব্যানারগুলোতে প্রার্থীদের ছবি, প্রতীক ও স্লোগান ছাপা হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে রাস্তায় টাঙানো হবে।’

রংপুর নগরীতে ফ্রেম তৈরি ও ব্যানার ছাপানোর কাজে ব্যস্ততা চরমে। ছবি: সারাবাংলা
এই ব্যস্ততা শুধু রংপুরে সীমাবদ্ধ নয়, অন্যান্য উপজেলা শহরেও একই চিত্র দেখা গেছে। জেলার ছয়টি আসনে মোট ৫৬ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করলেও যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থী সংখ্যা কমেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী-নেতৃত্বাধীন জোটসহ অন্যান্য দলগুলো এখন ফেস্টুন এবং ব্যানার দিয়ে গণসংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
স্থানীয় একজন প্রার্থীর ক্যাম্পেইন ম্যানেজার সুজন ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘পোস্টার ছাড়া প্রচার চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু, এটি আমাদের আরও সৃজনশীল করে তুলেছে। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ও লাইভ সেশনের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাব।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুসারে, এই নিষেধাজ্ঞা পরিবেশ দূষণ কমাবে এবং প্রচার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখবে, যা অতীতে পোস্টারের অপচয়ের কারণে সমালোচিত হয়েছে।
এই নতুন আচরণবিধি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এনসিপির এক নেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘পোস্টার নিষিদ্ধকরণ পরিবেশের জন্য ভালো। কিন্তু, ছোট দলগুলোর জন্য প্রচার আরও কঠিন হয়েছে।’ অন্যদিকে, বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো ডিজিটাল প্রচারকে স্বাগত জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রংপুরের নির্বাচনি উত্তাপ নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে অনেকে এই পরিবর্তনকে ‘সবুজ নির্বাচন’ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরী সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই পরিবর্তনের ফলে প্রচার আরও ডিজিটাল ও সরাসরি জনসংযোগমুখী হয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে পুরনো অভ্যাসের কারণে নিয়ম লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি মনে করেন, ‘রংপুরের মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে এসব ফেস্টুন ও ব্যানার দিয়ে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। সার্বিকভাবে, পোস্টারহীন এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছে। রংপুরের মতো অঞ্চলে এই ব্যস্ততা দেখে মনে হয়, প্রচার এখন আরও পরিবেশসম্মত ও প্রযুক্তিমুখী হবে, যা ভোটারদের কাছে আরও স্বচ্ছ বার্তা পৌঁছে দেবে।’
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, এই পরিবর্তন দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে বল মনে করেন এই বিশ্লেষক।