কুষ্টিয়া: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক জাগরণ— সবক্ষেত্রেই কুষ্টিয়ার অবদান অনন্য। তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) ১৯৭১ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া ছিল দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চলগুলোর একটি।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ কুষ্টিয়ায় শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে, যদিও বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটি এখানকার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তবে, ২০০৮ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ ফের জেলার সব আসনে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মাঠে নেই আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। এই পরিস্থিতিতে মাঠ ঘুছিয়ে ফের রাজনীতিতে সরব হয়েছে বিএনপি। সেইসঙ্গে সরব আওয়ামী লীগ আমলে কোণঠাসা হয়ে থাকা জামায়াতে ইসলামীও।
সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত কুষ্টিয়া বাউল সম্রাট লালন ফকির, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ, সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, কাঙাল হরিনাথ ও বিপ্লবী বাঘা যতীনের জন্মভূমি হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত। আশির দশকে কুষ্টিয়া ছিল চরমপন্থী রাজনীতির কেন্দ্র। তবে আজও এই জেলা তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
স্বাধীনতার পর থেকে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে এখন পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাঁচবার করে বিজয়ী হয়েছে। বাকি দুটি নির্বাচনে ন্যাপ ও জাতীয় পার্টি একবার করে জয় পায়।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জমে উঠছে রাজনৈতিক উত্তাপ। এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক সোহরাব উদ্দিনের পক্ষে মনোনয়নপত্র কিনলেও জমা দেননি তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামিয়েছে ইসলামিক বক্তা জেলা জামায়াতের ইউনিট সদস্য মুফতি আমির হামজাকে। বিএনপি এই আসনে শক্ত অবস্থানে থাকলেও দলীয় কোন্দল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সুযোগে জামায়াতে ইসলামী প্রভাব বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ জোরদার করেছে। তবে বিএনপির মধ্যে কোনো দলীয় কোন্দল নেই বলে দাবি করেছেন প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার।
অন্যদিকে এই আসনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রভাব তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুল্লাহ আকন্দ, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির রুম্পা খাতুন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মীর নাজমুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের মোহা. শরিফুল ইসলাম নির্বাচনের মাঠে লড়বেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং দলীয় প্রভাবের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সততা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হয়েছে, তবুও কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষি বাজারে অনিয়ম এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব ইস্যুই আসন্ন নির্বাচনে ভোটের মাঠে প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাধারণ ভোটাররা বলছেন, প্রতিবার নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক আশ্বাসের ফুলঝুড়ি ছুটলেও পরে তাদের সমস্যার কথা কেউ শোনে না। এবার তারা এমন একজন প্রতিনিধি চান, যিনি তরুণদের চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে কাজ করবেন। ভোটারদের দাবি, গ্রামীণ সড়ক, খাল-বিল ও হাট-বাজারে উন্নয়ন জরুরি। তারা বলেন, যে প্রার্থীই মাঠে আসুক না কেন, আগে গ্রাম ঘুরে দেখুক, তারপর ভোট প্রার্থনা করুন।
নির্বাচন নিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের অনেক বড় দল, অনেক যোগ্য নেতাকর্মী আছে। এই জায়গা থেকে হয়তো অনেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিল। দল মনোনয়ন দিয়েছে একজনকে। সবাই সেই একজনের হয়েই কাজ করছে। আমরা আশা করি, এবারের নির্বাচন উৎসবমুখর হবে।’
অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুফতি আমির আমজা সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৭ বছর পরে যেহেতু জনগণ ভোট দিতে পারছে, সেহেতু আশা করি দাঁড়িপাল্লা বিজয়ী হবে- ইনশাল্লাহ। তবে আশঙ্কার জায়গা হলো, থানা লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখনো উদ্ধার হয়নি। সেগুলো নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।’
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য মতে, কুষ্টিয়া সদর ও ইবি থানা নিয়ে নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ৭৭, কুষ্টিয়া-৩। ৩১৬ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটারের এই আসনটি ১৩ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৩৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৭৫ জন আর পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৭ হাজার ২৫৯ জন।