Saturday 14 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উত্তরে জামায়াত জোটের ১৮ আসন
ভেঙেছে জাপার দুর্গ, ভোট বিভাজনে পিছিয়েছে বিএনপি

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৮

১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৩৩টি আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ১৮টিতে জয়ী হয়ে চমক দেখিয়েছে। এ অঞ্চলে বিএনপি ১৪টি আসনে জিতলেও প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পেয়েছে। আর এরশাদবিহীন জাতীয় পার্টি (জাপা) একটি আসনও না পেয়ে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে যে, রংপুর অঞ্চলে জাপার দুর্গ ভেঙে পড়েছে।

নির্বাচনে বিভাগের রংপুর জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াত এবং একটিতে জোটমিত্র এনসিপি জয়ী হয়েছে। কুড়িগ্রামের চারটি আসনেই জোটের প্রার্থীরা, নীলফামারীর চারটিতেই জামায়াত এবং গাইবান্ধার পাঁচটির মধ্যে চারটিতেও জামায়াত বিজয়ী হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের উত্থান মূলত আওয়ামী লীগের দমনমূলক শাসন, সাংগঠনিক শক্তি এবং ধর্মীয়-সামাজিক রক্ষণশীলতার ফল। আর জাপার হার অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্যতার খেসারত। তবে বিএনপির কম জয় জামায়াতের সঙ্গে ভোট বিভাজন ও স্থানীয় দুর্বলতার কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

জামায়াতের বিজয়ের কারণ কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, রংপুর বিভাগে জামায়াতের অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের দমনমূলক শাসন জামায়াতের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। এমন মন্তব্য অবশ্য সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জামায়াতের যা উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা আওয়ামী লীগের দমনের ফল। তারা বিরোধীদলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিয়ে এ অবস্থা সৃষ্টি করেছে।’

দ্বিতীয় কারণ, জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তৃণমূলে কার্যক্রম তাদের ভিত্তি দৃঢ় করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজু সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘রংপুরের গ্রামীণ সমাজ, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং স্থানীয় নেতাদের তৎপরতা জামায়াতের মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়। সেইসঙ্গে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ও দারিদ্র্যও তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে।’

তৃতীয়ত, ১১ দলীয় জোটের মাধ্যমে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভোট বিভাজন কমিয়ে সাফল্য পেয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, জামায়াতের সমর্থন ২৯ শতাংশ, যা বিএনপির ৩৩ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শক্তি জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছে, যা তাদের জনপ্রিয় করে তুলেছে।

জাতীয় পার্টির শোচনীয় হারের কারণ কী?

জাতীয় পার্টি (জাপা) রংপুর বিভাগে ৩২টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটিও জিততে পারেনি— যা দলটির ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকায় অভাবনীয় পরাজয়। এর মূল কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে গত ১৬ বছরের সখ্যতাকে দায়ী করা হচ্ছে। এগুলো দলটির স্বাধীন পরিচয় নষ্ট করেছে।

এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট হয়েছে। রংপুরে ভোটাররা বলছেন, জাপা আওয়ামী লীগের ছায়ায় থেকে স্বতন্ত্রতা হারিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ আসনে মাত্র ৩৭ হাজার ৯৩৩ ভোট পেয়েছেন। যেখানে জামায়াতের মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।

আবার দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনে ২১ হাজার ৩৯০ ভোট পেয়েছেন। রায়ান আহমেদ রাজু বলছেন, ‘জাপার কার্যক্রম মন্থর ছিল এবং ভোটব্যাংক হারিয়েছে। দলটির প্রচারে উদ্যোগের অভাব এবং নির্বাচনি খরচ বিতরণে অনিয়মও হয়েছে। ফলে দলটির এই দুরাবস্থা দেখা দিয়েছে।’

রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে বিজয়ী প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন মনে করেন, ‘এবারের নির্বাচনে রংপুরের জনগণ জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এটাই আমাদের বড় বিজয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুরের ছয়টি আসনে ১১ দলীয় জোট জয়লাভ করেছে। একটি আসনে শাপলা কলি এবং পাঁচটি আসনে দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে এবারের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগও রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।’ আখতার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ৫ আগস্ট যেমন প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, ১২ ফেব্রুয়ারি তেমনি রংপুরের জনগণ সেই স্বৈরাচারের দোসরদের প্রত্যাখ্যান করেছে।’

বিএনপি কেন এত কম আসনে জয়ী হলো?

বিএনপি রংপুর বিভাগে ১৪টি আসনে জয় পেয়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে কম। জামায়াতের সঙ্গে ভোট বিভাজন ও প্রতিযোগিতাকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল অবশ্য বলেছেন, ‘জামায়াতের উত্থান আওয়ামী লীগের দমনের ফল। কিন্তু, এতে বিএনপির ভোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

রংপুরে জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো বিএনপির পথে বাধা হয়েছে। স্থানীয়স্তরে বিএনপির দুর্বলতা এবং জামায়াতের ধর্মীয় আবেদনও কারণ। জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ, যা ভোট বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা সুষ্ঠু রাজনীতি করলে জনগণ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে।

উল্লেখ্য, রংপুর বিভাগে মোট ভোটার ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৯৫ জন। নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ ছিল এবং গড় উপস্থিতি ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে জামায়াতের বিজয় উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজু।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর