Sunday 22 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন হলে কে হবেন বিএনপির চেয়ারপারসন, জুবাইদা নাকি জাইমা?

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৫১ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৮

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এরই মধ্যে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের এমপি ও মন্ত্রীদের শপথও অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিএনপি দলীয় এমপিরা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পড়েন। তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’র সদস্য হিসেবে শপথটি এড়িয়ে যান। বিএনপি বলছে, বিষয়টি নিয়ে সংবিধানে কিছু উল্লেখ নেই। ফলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একইসঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। সেই আদেশের ভিত্তিতে যে গণভোট হয়েছে, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৭৭ এমপি দু’টি শপথই পড়েন। এদিকে বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এনসিপি বলছে, গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করছে সরকার। আর জামায়াত বলছে, বিএনপির এমপিরা দু’টি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়াই তো অর্থহীন। তবে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতে তাদের ৩১ দফা বাস্তবায়নের দিকেই হাঁটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও ফলাফল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে।

এসবের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে, যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী, সরকার প্রধান দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না। ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন না।’ যেহেতু তারেক রহমান বর্তমানে দলের চেয়ারম্যান এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের এই বৈপ্লবিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে, তারেক রহমানকে দলীয় প্রধানের পদটি ছাড়তে হবে। সেক্ষেত্রে কে হবেন বিএনপির পরবর্তী কাণ্ডারী বা চেয়ারপারসন? কার হাতে-ই-বা উঠবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের বাটন? এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তারেক রহমানের ছেড়ে দেওয়া চেয়ারটিতে কে বসবেন? জুবাইদা রহমান নাকি তরুণ প্রজন্মের আইকন জাইমা রহমান? নাকি অন্য কেউ?

জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকার ও নেতৃত্বের হাতিয়ার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় দলগুলোর চালিকাশক্তি সবসময়ই নির্দিষ্ট পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে আবর্তিত হয়েছে। বিএনপির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নেতৃত্বের মশালটি সবসময় জিয়া পরিবারের হাতেই ছিল। কিন্তু বর্তমানে ‘জুলাই সনদ’র প্রতিশ্রুতি এবং তারেক রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের পর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে ‘এক নতুন শূন্যতা’ বা ‘পরিবর্তনের প্রয়োজন’ দেখা দিয়েছে। তবে দলের ঐক্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় এই পরিবারের বিকল্প কেউ তৈরি হয়নি। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে এই পরিবারটি কেবল নেতৃত্ব নয়, বরং আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল। তাই সংস্কারের হাওয়া বইলেও বাটনটি যে পরিবারের ভেতরেই থাকছে, তা নিয়ে দলের ভেতর দ্বিমত খুব একটা নেই। কিন্তু কে ধরবেন সেই নেতৃত্বের হাল?

কে পরবর্তী নেতৃত্বে- জুবাইদা, জাইমা, নাকি শর্মিলা?

বিএনপির তৃণমূল ও নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও আস্থার নাম জিয়া পরিবার। ফলে নেতৃত্বের ব্যাটন এই পরিবারের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। আলোচনায় এখন তিনটি নাম সবচেয়ে বেশি জোরালো- জুবাইদা রহমান, জাইমা রহমান ও শর্মিলা রহমান।

তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান শিক্ষিত, মার্জিত এবং জিয়া পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তিনি দলের জন্য একটি ‘ইমেজ’ হিসেবে কাজ করতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুবাইদা রহমান যদি দলের হাল ধরেন, তবে তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রশাসনিক উভয়দিক থেকে দলকে সুসংহত করতে পারবেন। বিশেষ করে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তার সমন্বয় ভালো হবে বলে ধারণা করা হয়।

অন্যদিকে জুবাইদা রহমানের কন্যা জাইমা রহমান কয়েক বছর ধরে ভার্চুয়াল রাজনীতি এবং লন্ডনে দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়। তরুণ প্রজন্মের কাছে জাইমা এক নতুন উদ্দীপনার নাম। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেখানে তারেক রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে জাইমাকে সামনে এনে বিএনপি সেই তারুণ্যের সেন্টিমেন্ট ধরতে পারে। তবে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবকে অনেকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। সেখানে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব তার জন্য একটি বড় প্রশ্ন হতে পারে। যদিও আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখছে বিএনপির তরুণ নেতৃত্ব।

অপরদিকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং দুই কন্যা জাফিয়া ও জাহিয়া রহমানের রাজনীতিতে আসা নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। এক সময় শোনা যেত যে, কোকোর পরিবার কিছুটা বঞ্চিত। তবে নির্বাচনের আগে শর্মিলা রহমানের সক্রিয় প্রচার এবং দলের দুঃসময়ে লন্ডন ও ঢাকার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরির বিষয়টি এই গুঞ্জন অনেকটা কমিয়ে এনেছে। জিয়া পরিবারের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে শর্মিলা রহমান সিঁথিও চমক হিসেবে চেয়ারপারসন পদে আসতে পারেন।

কেন জিয়া পরিবারের বাইরে কেউ নয়?

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, জুলাই সনদের সংস্কারের হাওয়ায় কেন দলের কোনো সিনিয়র নেতা (যেমন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্য) চেয়ারপারসন হতে পারবেন না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে। বিএনপি মূলত জিয়া পরিবারের আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে। দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখতে এই পরিবারের কোনো বিকল্প এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। সিনিয়র নেতারা মূলত ‘অভিভাবক’ হিসেবে থাকলেও ‘সিম্বলিক হেড’ বা দলীয় প্রধান হিসেবে ‘জুবাইদা’ বা ‘জাইমাকেই’ বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করেন নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়াতে এবং বিবাদমান গ্রুপগুলোকে এক সুতায় বাঁধতে জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যের ‘ছায়া’ থাকাটা অপরিহার্য।

তারেক রহমান কি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরবেন, আর দলের কাণ্ডারি হিসেবে পরিবারের অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করবেন? এটিই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। ডা. জুবাইদা রহমানের অভিজ্ঞতা নাকি জাইমা রহমানের নতুনত্ব-শেষ পর্যন্ত কার ওপর আস্থা রাখবে বিএনপি? সেটি নির্ভর করছে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং বর্তমান ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটের ওপর। অভিজ্ঞতার বিচারে ডা. জুবাইদা রহমান এগিয়ে থাকলেও, আগামীর বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জাইমা রহমানকেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত বিএনপি কি ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি কঠোরভাবে মেনে পরিবারের বাইরে নেতৃত্ব দেবে, নাকি জিয়া পরিবারের আস্থাতেই নতুন ইতিহাস লিখবে?

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের রায়ের কারণে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্যই হয়ে যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার অন্যদিকে যেসব সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, তারা জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন। তাদের মতে, জুলাই আদেশে এ ধরনের সুযোগ থাকায় একে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিএনপি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বাস্তবায়নের দিকে নাও হাঁটতে পারে। ফলে তাদের দলীয় প্রধান পরিবর্তনের বিষয়টি তখন এগোবে কি না সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

কেরাণীগঞ্জে র‌্যাবের বাজার মনিটরিং
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৬

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর