Saturday 07 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঢাকায় জামায়াতের আসনগুলোতেই ‘চাঁদাবাজির’ হটস্পট, মিলবে কি পরিত্রাণ?

উজ্জল জিসান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৭ মার্চ ২০২৬ ১৯:২২ | আপডেট: ৭ মার্চ ২০২৬ ১৯:২৩

ঢাকায় জামায়াতের আসনগুলোতেই ‘চাঁদাবাজির’ হটস্পট। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আর বিরোধীদল হিসেবে সংসদে গিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আর রাজনীতির পালাবদলে বিএনপির পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় হয় আওয়ামী লীগ আমলে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী।

বিকল্প এক পরস্থিতিতে যখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়, তখন বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াত আলাদা হয়ে রাজনীতির মাঠ দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এই মাঠ দখল করতে গিয়ে বিএনপি বিরোধিতাও তাদের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। আর এই বিরোধিতার প্রধান অস্ত্র হিসেবে তারা ব্যবহার করতে থাকে ‘চাঁদাবাজি’ শব্দ। এই শব্দটি তারা বেশিরভাগ সময় বিএনপির সঙ্গে জুড়ে দিতে থাকে। তবে এটিও সত্য যে, গত দেড়বছরে ‘চাঁদাবাজি’র কারণে বিএনপির কয়েকশ’ নেতাকর্মী বহিষ্কার হয়েছেন। কিন্তু কেবল বিএনপি নয়, জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে বিএনপি সরকারর গঠন করলেও নিজেদের শক্তিশালী বিরোধীদল হিসেবে সংসদ ও রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, সংস্কারের জন্য আন্দোলনের পাশাপাশি দেশে যেকোনো জুলুম ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারা সক্রিয় থাকবে। আর তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা। সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট যে কয়েকটি আসনে বিজয়ী হয়েছে সেই আসনগুলোই চাঁদাবাজির হটস্পট।

রাজধানীতে জামায়াত ছয়টি আসনে জয় পেয়েছে। আর একটি আসনে জয় পেয়েছে তাদের জোটমিত্র এনসিপি। ঢাকা-৪ ও ৫, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ১৫ ও ১৬ আসন জামায়াতের প্রার্থীরা জিতেছেন। অন্যদিকে ঢাকা-১১ আসন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয় পেয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠন হলেও এমপিরা স্ব স্ব এলাকায় প্রতিনিধিত্ব করবেন। এতে বিরোধীদলের আসনগুলোতে সরকারি দল খুব বেশি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা শহরের এই অসনগুলোতে চাঁদাবাজির হটস্পট বেশি।

সাধারণ জনগণ বলছে, জামায়াত চাইলেই এসব স্থানে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারে। মানুষের প্রশ্ন, জামায়াত আদৌ কি চাঁদাবাজি বন্ধ করবে? নাকি শুধু মুখেই বলে যাবে। জামায়াত চাঁদাবাজি বন্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিই আসলে দেখার অপেক্ষায় সমগ্র জাতি।

চাঁদাবাজির হটস্পটগুলো

ঢাকা-৪ আসন রাজধানীর শ্যামপুর-কদমতলী থানা এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে। এই আসনে জামায়াতের জয়নুল আবেদীন জয়ী হয়েছেন। জুরাইন, পোস্তগোলা, শ্যামপুর, কদমতলী, শনির আখড়া এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৪ আসন। এই এলাকাগুলোতে বড় বড় মার্কেট, ফুটপাত ও বড় বড় শিল্প কারখানা রয়েছে। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বড়ধরনের চাঁদাবাজি হয়ে আসছে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসন। এই আসনের যাত্রাবাড়ী বাজার ঢাকার সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি। এখানে রয়েছে তিনটি বড় বাস টার্মিনালের একটি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। এখান থেকে দেশের অর্ধেক জেলায় গাড়ি চলাচল করে। যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় প্রচুর সংখ্যক ফুটপাত মার্কেট ও শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব স্থানে প্রচুর পরিমাণে চাঁদাবাজি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি জুলাই আন্দোলনে ওই এলাকায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি একজন জুলাই যোদ্ধাও।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা, তেজগাঁও থানা, হাতিরঝিল থানা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১। এই আসনে ফার্মগেট, আগারগাঁও, বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতাল, তেজগাঁও ট্রাক স্টান্ড, কারওয়ান বাজার, মহাখালী বাস টার্মিনাল, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা রয়েছে। এ ছাড়া, এই আসন এলাকায় অসংখ্য শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব জায়গায় কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই আসনে এমপি হয়েছেন জামায়াতের সাইফুল ইসলাম মিলন।

ঢাকা-১৪ আসনটি রাজধানীর মিরপুর-৬০ ফিট সড়ক থেকে শুরু করে বাংলা কলেজ, মিরপুর-১ ও ২, শাহ আলী, মাজার রোড, দারুস সালাম, কল্যাণপুর, গাবতলী ও পর্বতা এলাকা নিয়ে। এই আসনে ফুটপাতে অনেক বেশি চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। আছে গাবতলী বাস টার্মিনাল ও কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড, যেখানে আন্তঃজেলা বাসগুলোর কাউন্টার রয়েছে। এই আসনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের ব্যারিস্টার আরমান। যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমালে দীর্ঘদিন ডিজিএফআইয়ের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আয়নাঘরে গুম ছিলেন।

ঢাকা-১৫ আসনটি রাজধানীর কাফরুল থানাধীন ক্যান্টনমেন্ট, কাফরুল, ইব্রাহিমপুর, শেওড়া পাড়া, মধ্যপীরেরবাগ, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, সেনপাড়া পর্বতা এলাকা নিয়ে গঠিত। এই আসনে ব্যাপকভাবে ফুটপাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এখানে রয়েছে একাধিক পাইকারি মার্কেট। এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

ঢাকা-১৬ আসনটি রাজধানীর পল্লবী ও রুপনগর থানা নিয়ে গঠিত। এই আসনে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ এলাকা রয়েছে। এই এলাকায় প্রচুর মার্কেট ও অসংখ্য গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণে চাঁদাবাজির হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন।

জনগণ ও ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে যে কয়েকটি জায়গায় ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি হয় তার বেশিরভাগ এলাকাতেই জামায়াতের এমপিরা নির্বাচিত হয়েছেন। যে কয়েকটি বাস টার্মিনাল রয়েছে তার প্রতিটিই জামায়াত এমপির আসনে পড়েছে। যতগুলো শিল্প ও পোশাক কারখানা রয়েছে তার বেশিরভাগই নির্বাচিত জামায়াতের এমপিদের এলাকা।

মিরপুর-১০ নম্বরে দাঁড়িয়ে কথা হয় রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যাংকারের সঙ্গে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘মিরপুর-১০ এলাকায় সাধারণ মানুষ হাঁটার রাস্তায় পায় না। পুরো ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। এমনকি সড়কের অর্ধেকও হকারদের দখলে। বাসে এলে সিগন্যাল পার হতে অনেক সময় লাগে। রমজান মাস সব যেন স্থবির হয়ে পড়ে। আমরা হকারমুক্ত ফুটপাত চাই। হাঁটার রাস্তা চাই। এতে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। আর চাঁদাবাজি বন্ধ হলে সন্ত্রাসী কার্ক্রমও বন্ধ হবে।’

ফার্মগেটে ইন্দিরা রোডে কথা হয় হোটেল ব্যবসায়ী দীপু শিকদারের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ফুটপাতে হাঁটার মতো কোনো স্পেস নেই। ফলে অনেকে সড়ক দিয়ে চলাচল করে। এতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে ও প্রাণহানি হয়। মানুষের চলার জন্য ফুটপাত হকারমুক্ত চাই। এর আগের সরকারগুলো ফুটপাত হকার মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা চাঁদাবাজিও বন্ধ করত পারেনি। এবার স্থানীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের। দলটি ইশতেহারে বলেছে, তারা তাদের এলাকায় সবধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করবে। এবার দেখা যাক, আসলে তারা কী করে।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানদার আরিফুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘কারওয়ান বাজার চাঁদাবাজ মুক্ত হবে- এটা জামায়াতের সাইফুল ইসলাম মিলন এমপি হওয়ার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, তিনি কারওয়ান বাজার চাঁদাবাজ মুক্ত করতে পারেন কিনা।’

বাস টার্মিনালগুলোতে চাঁদাবাজি হয় এটা সবাই জানে। তবে এবার বাস সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আশায় বুক বাঁধছেন। এস আর পরিবহণের সহকারী ম্যানেজার বিল্লাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই সেক্টরে আর চাঁদাবাজি হবে না বলে ধরে নিচ্ছি। আর যদি হয়ও সেটি যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কারণ, যেহেতু টার্মিনালগুলোর স্থানীয় এমপি জামায়াতের। তারা কথা দিয়েছেন যে, কোনো চাঁদাবাজি হতে দেবেন না। আগে স্থানীয় এমপির লোকজনই চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকাতো। এবার দেখা যাক কী হয়।’

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের একুশে পরিবহণের কাউন্টার ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম সাগর সারাবাংলাকে বলেন, ‘যারা টাকা নেয় গত কয়েকদিনে তাদের কেউ আসেনি। সামনে কী হবে জানি না। দেখা যাক, চাঁদাবাজি বন্ধ হয়, নাকি বাড়ে।’

জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন যা বলছে

ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল ইসলাম মিলন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘অবশ্যই কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। সবার সহযোগিতা চাই।’

চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি নানাভাবে যুগে যুগে হয়ে আসছে। সরকারদলীয় লোকজনের ছত্রছায়ায় হোক, আর তাদের ব্যবহার করেই হোক- সেটা হতো। বর্তমান সরকার চাঁদাবাজি বন্ধে যেরকম নির্দেশনা দেবে সে অনুযায়ীই পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে যারা চাঁদা দেবে তাদের ভূমিকা বড়। তারা যদি চাঁদা না দিয়ে আইনি প্রতিকার চায়, তাহলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। যেকোনো চাঁদাবাজি বন্ধে ডিএমপি বদ্ধ পরিকর। জনগণের সহযোগিতায় এসব বন্ধ করতে ডিএমপি বদ্ধ পরিকর। এরই মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে।’ পুলিশ সেগুলো নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর