Sunday 28 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পুলিশের অভিযান ‘নাটক’, নেতাকে নিয়ে গেল কর্মীরা!

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ জুন ২০২৬ ২০:৩০

রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক। ফাইল ছবি

রাজশাহী: শনিবার (২৭ জুন) রাত পৌনে ১১টা। নগরীর বোয়ালিয়া থানার নিউমার্কেট এলাকায় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক আসাসের বাসায় অবস্থান করছিলেন রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক। এ সময় মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল ছয়তলা ভবনটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসাসের বাসার ছাদ থেকে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফ দেন মীর তারেক। এতে তিনি আহত হন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরেকজনও আহত হয়েছেন।

ঘটনার পরপরই নিজের ফেসবুক আইডিতে দুটি স্ট্যাটাস দিয়ে মীর তারেক লেখেন, ডিবি পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার আহ্বান জানান। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ভবনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ছাদে অবস্থান করেই মীর তারেক ফেসবুক লাইভ করেন। লাইভে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেফতার করতে এসেছে। তিনি দাবি করেন, পুলিশ ডাকলে তিনি নিজেই হাজির হতেন। কিন্তু, এভাবে অভিযান চালানো উচিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ডিবি পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশের সদস্যরাও সেখানে অবস্থান করছেন। ভবনের সামনে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিচ্ছেন। পরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) ক্রাইসিস রেসপন্স টিমও (সিআরএটি) লাঠি হাতে সেখানে পৌঁছায়। কিছু সময়ের জন্য এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করে। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ধীরে ধীরে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর নেতাকর্মীদের একটি অংশও স্থান ত্যাগ করেন।

রাত ১টা ১২ মিনিটের দিকে প্রায় ১০০ মোটরসাইকেলের একটি বহর ঘটনাস্থলে আসে। এর পর আহত মীর তারেককে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু যে ভবনের ছাদে তিনি পড়ে ছিলেন, সেই ভবনের কলাপসিবল গেটের চাবি পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। এ সময় ভবনের নিচতলার সিসি ক্যামেরাগুলোর দৃশ্য আড়াল করার চেষ্টাও দেখা যায়। একটি ক্যামেরার সামনে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয় এবং অন্যটির সামনে হেলমেট ধরে রাখা হয়। পরে একটি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধার অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিকদের ক্যামেরা ব্যবহার না করার অনুরোধ করেন। কেউ কেউ হুমকি ও অশালীন আচরণও করেন বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

এর পর রাত ১টা ৩৯ মিনিটের দিকে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরা অবস্থায় প্রথমে একজন আহত ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে একইভাবে বের করা হয় মীর তারেককে। তাকে মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তার সঙ্গে আহত হওয়া অপর ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ২১ জুন নগরের শাহমখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় মীর তারেকের ভাড়া বাসায় গুলিবিদ্ধ হন ফয়সাল বাঁধন (৩০) নামের এক যুবক। ওই ঘটনায় পুলিশ একটি অবৈধ পিস্তল, দু’টি ম্যাগাজিন, গুলির খোসা, ককটেল ও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবি করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করে।

ঘটনার সময় করা ফেসবুক লাইভে ছাত্রদল নেতা দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরকের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। এ সবের ব্যাপারে বাঁধনই বলতে পারবে বলে আসাস লাইভে জানান। লাইভে মীর তারেকও বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। আর আসাস লাইভে জানান, পুলিশ এসেই তার কাছে ওই অস্ত্র ও বিস্ফোরক সম্পর্কে জানতে চেয়েছে।

এদিকে মীর তারেক শুধু সাম্প্রতিক অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গেই আলোচনায় নন, তিনি একটি হত্যা মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি। গত বছরের ৭ মার্চ নগরের দড়িখড়বোনা এলাকায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন রিকশাচালক গোলাম হোসেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী পরিবানু বেগম বাদী হয়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি মীর তারেক।

থানা সূত্রে জানা গেছে, মামলার কোনো আসামিকেই এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি এবং কেউ আদালতেও আত্মসমর্পণ করেননি। ফলে পুলিশের নথিতে তারা এখনও পলাতক হিসেবে বিবেচিত। তবে শনিবার রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও মীর তারেককে গ্রেফতার না করায় প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া একই হত্যা মামলার আরেক এজাহারভুক্ত আসামি শাহমখদুম থানা বিএনপির আহ্বায়ক সুমন সরদারও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। আহত মীর তারেককে মোটরসাইকেলে করে সরিয়ে নেওয়ার সময় সুমন সরদারকে তার সঙ্গে দেখা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমপির মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘পুলিশ মীর তারেককে গ্রেফতার করতে যায়নি। অন্য এক আসামিকে ধরতে সেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই আসামিকে না পেয়ে এবং বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি বলে নিশ্চিত হয়ে পুলিশ ফিরে আসে।’

হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ার পরও কেন মীর তারেককে গ্রেফতার করা হয়নি?- এমন প্রশ্নের জবাবে গাজিউর রহমান বলেন, ‘মামলাটি পুরোনো। মামলার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা না করে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। গত রাতে অন্য ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ধরতে গিয়েছিল অভিযানিক দল। একই জায়গায় বাড়ি হওয়ায় সে ভেবেছে আমরা তাকে ধরতে গিয়েছিলাম।’

এদিকে রোববার (২৮ জুন) দুপুরে মীর তারেকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে রাতের ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেন, তারা কোথাও পালিয়ে ছিলেন না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডাকলে তারা নিজেরাই হাজির হতেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর