Saturday 29 Nov 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বন্ধ্যাত্ব দূর করতে ‘পানি পড়া’, প্রতারণার শিকার শত শত নারী-পুরুষ

স্পেশাল করেসপডেন্ট
২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:২৩

ঝাড়-ফঁক করছেন কবিরাজ জামাল শেখ। ছবি: সারাবাংলা

বগুড়া: একবোতল ‘পানি পড়া’য় মিলছে রোগীদের নানা রোগের সমাধান। ওই পানি পড়া খেয়ে বন্ধা নারীদের গর্ভে আসছে সন্তান। এমন বিশ্বাসে প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করছেন বগুড়ার বেড়াপাঁচবাড়িয়া গ্রামের কবিরাজ জামাল শেখের বাড়িতে। এ যেন ডিজিটাল যুগে এনালগ প্রতারনা। পানি পড়া দিয়ে করা হচ্ছে অভিনব প্রতারণা, হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে এমন প্রতারণার ঘটনা ঘটলেও এই কবিরাজকে এখনো আইনের আওতায় নেওয়া হয়নি।

সারিয়াকান্দির প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে ওই কবিরাজের প্রতারনায় নিঃস্ব হচ্ছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল কাজলা ইউনিয়নের বেড়াপাঁচবাড়িয়া গ্রামে ঝাড়-ফুঁক দিয়ে বন্ধা নারীদের বন্ধ্যত্ব দূর করার নামে ভুয়া চিকিৎসা করে আসছেন কবিরাজ জামাল শেখ। চিকিৎসার জন্য প্রাথমিকভাবে নেওয়া হচ্ছে পাঁচশ টাকা। আর বাচ্চা হওয়ার পর দিতে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। এভাবে গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের সঙ্গে প্রতারনা করে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ওই কাবরাজ। উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা না থাকায় প্রাচীনকাল থেকেই এ ধরনের ভুয়া চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন গ্রামের মানুষ।

বেড়াপাঁচবাড়িয়া গ্রামের কবিরাজ জামাল শেখ এক বছর ধরেই চালিয়ে যাচ্ছেন এই কবিরাজী চিকিৎসা। তার পানি পড়ায় বন্ধ্যা নারীদের গর্ভে সন্তান আসছে। অন্ধবিশ্বাসে জামাল শেখের বাড়িতে বগুড়া, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, সিরাজগঞ্জ, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছুটে আসছেন শত শত মানুষ।

জামাল শেখের ছেলে জানান, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত নারী-পুরুষ এখানে পানি পড়া নিতে ছুটে আসেন। সন্তান ধারণের জন্য পানিপড়া বাবদ সবাইকে ৫০০ টাকা করে জমা দিতে হয়। তার বাবা নাকি স্বপ্নে এ আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

কবিরাজ জামাল শেখ বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর আগে স্বপ্নে তাকে ১৫ পাড়া কোরআন পড়ে শুনানো হয়। তারপর স্বপ্নেই তাকে আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদান করা হয়। তাকে বলা হয় তুমি যেকোনো নিয়ত করে একটু ঝাড়-ফুঁক দিও। এরপর এক অসুস্থ রোগীকে ঝাড়-ফুঁক দেই। ওই রোগী ১০ মিনিটের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। পরে ওই রোগী এক নারীকে বিষয়টি জানায়। ১৫ বছর বিয়ের পরেও ওই নারীর কোনো সন্তান ছিল না। পরে নারীটি তার কাছে এসে পানি পড়া নেয়। এতে তার গর্ভে সন্তান আসে। পরে ওই নারী যখন ৫ মাসের গর্ভবতী তখন এই কথা সবাইকে বলে দেয়। এভাবে আমার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বিষয়টি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন আমার বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করে। আমার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ১০ জন মা হয়েছেন। সন্তান দেন ওপরওয়ালা, আমি এখানে উছিলা মাত্র।’

চিকিৎসা নিতে আসা ফরিদ মিয়া জানান, ‘১৫ বছর আগে বিয়ে করেছি। এখনো সন্তান হয়নি। শুনেছি বাবার পানিপড়া দিয়ে অনেকেরই সন্তান হয়েছে। তাই বাবার কাছে এসেছি পানিপড়া নিতে। শুনলাম এর জন্য প্রথমে ৫০০ টাকা জমা দিতে হচ্ছে।’

কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চরাঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে। এলাকার মানুষ ভালো কোনো চিকিৎসাসেবা না পেয়ে বিভিন্ন কবিরাজের কাছে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। চরাঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা চালু হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।’

সিভিল সার্জন ডাঃ খুরশিদ আলম জানান, ‘ঝাড়-ফুঁক কবিরাজী চিকিৎসার সঙ্গে মেডিক্যাল চিকিৎসার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা এবং কুসংস্কার থেকেই হয়ে থাকে। যারা একেবারেই তৃনমূল পর্যায়ে বসবাস করেন এবং যাদের মধ্যে এখনো শিক্ষার আলো পৌঁছেনি, তারাই এ ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী হন। বন্ধ্যাত্ব আধুনিক চিকিৎসারই একটি অংশ। এর চিকিৎসা অবশ্যই রয়েছে। যারা এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন তারা ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন। অবশ্যই অপনারা ভালো চিকিৎসা পাবেন।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর