রংপুর: আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠতেই নাগরিকদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানিত ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেছেন, ‘জনগণ একদিকে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলেও অন্যদিকে কমিশনের সক্ষমতা ও সাহস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। নিরাপত্তাহীনতা সার্বিক, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি আরও তীব্র। নতুন সরকারকে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ার প্রত্যাশা করছে সবাই।’
শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেলে রংপুরে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী আঞ্চলিক পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই মন্তব্য করেন। সকালে রংপুর নগরীর একটি হোটেলে সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা ও সমাধানের উপায় নিয়ে আয়োজিত এই সংলাপে উত্তরাঞ্চলের জনগণের বহুমুখী দাবি উঠে আসে। সিপিডি’র সাম্প্রতিক জরিপ অনুসারে, দেশব্যাপী নির্বাচনসংশ্লিষ্ট আলোচনায় নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা রংপুরের সভাতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা স্পষ্টভাবে জানান, নিরপেক্ষ প্রশাসন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়ে মানুষের কথায় প্রথমে যা উঠে এসেছে তা হলো নিরপেক্ষ প্রশাসনের দাবি। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ছাড়া নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এছাড়া, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ, যোগ্য ও সাহসী হতে হবে। তবে বর্তমান কমিশনের উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও নীতি প্রণয়ন নিয়ে জনগণের অসন্তোষ স্পষ্ট।’
সভায় আলোচিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল-দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধি: বন্যা, খরা ও তিস্তা বাঁধের মতো সমস্যা মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ, কৃষি ও অর্থনীতি: খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। সামাজিক নিরাপত্তা: নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। শাসনব্যবস্থা: রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক রূপ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার। শিক্ষা-স্বাস্থ্য: খাতের অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ত্রুটি দূর করা।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, উত্তরাঞ্চলের স্পেসিফিক সংকট যেমন বেকারত্ব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং বৈষম্যের চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে এসডিজি-সংশ্লিষ্ট সূচকগুলো জাতীয় গড়ের থেকে পিছিয়ে রয়েছে, যা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিকে জোরালো করেছে।
সভায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বড় দল যেমন বিএনপি বা জামায়াতের কোনো নেতা বা প্রার্থী অংশ নেননি। এটি নির্বাচনি সংলাপে বৃহত্তর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য এখন থেকেই সব পক্ষের সংযোগ অপরিহার্য।’
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জনগণের মনে যে আশঙ্কা রয়েছে, তা দূর করতে হবে। সভার সমাপনী বক্তব্যে সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সুশাসন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশকে মানুষের প্রধান দাবি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ধরনের আঞ্চলিক সংলাপগুলো নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পথ দেখাবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।